সাংঘাতিক নিপাত যাক, সাংবাদিক মুক্তি পাক

সাংঘাতিক নিপাত যাক, সাংবাদিক মুক্তি পাক

মানিক দত্ত : গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১ খ্রিঃ ৩দিন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)’র আয়োজনে অনুসন্ধ্যানমূলক সংবাদের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করলাম। প্রশিক্ষণের প্রথম দিন প্রশিক্ষণ দিলেন জুলফিকার আলী মাণিক। যিনি স্ট্রিংগার, নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং পরিকল্পনা পরামর্শক, বৈশাখী টিভি। তিনি ডেইলি সান, ভোরের কাগজ, বাংলা বাজার পত্রিকা সহ বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় কাজ করছেন। বর্তমানে বিদেশী মিডিয়াতে বেশী কাজ করছেন। তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অনুসন্ধ্যান মূলক খবর প্রকাশিত হয়েছে যেমন জহির রায়হান নিখোঁজ নয়, নিহত হয়েছেন, রামুর বৌদ্ধ বিহারে হামলা ফেসবুকে ফেক আইডিতে চক্রান্তমূলক উদ্দেশ্যমূলক ভাবে হামলা করা হয়েছে। আলোচিত ফাঁসি হওয়া বাংলা ভাই কে ছিলেন, কেন তাকে ভাড়া করা হয়েছিল, কে ভাড়া করেছিল ইত্যাদি।
তিনি তার উপস্থাপনায় উল্লেখ করলেন এবারই তিনি প্রথম শেরপুর আসলেন না। এর আগেও ১৯৯৪ সালে একবার শেরপুর এসেছিলেন একটি অনুসন্ধ্যানমূলক খবরের জন্য। তখন বেশ কয়েকজনকে নিয়ে কাজ করেছেন বলেছেন কিন্তু কাকে কাকে নিয়ে কাজ করেছেন তাদের নাম বলেননি। আমিও তাকে বা আমাদের সহকর্মীদের বলি নাই উনার সাথে আমিও ছিলাম। বিশেষ করে একজনের কথা বলেছেন তার পরিচিত একজনের মাধ্যমে কাকলি গেস্ট হাউজে থেকেছেন যদিও নাম বলেননি। সেই লোকটি হলো সদ্য অকাল প্রয়াত আমার এক বছরের ছোট হলেও আমরা বন্ধুর মত চলতাম, আমাদের ছেড়ে চলে যাওয়া শাহরিয়ার রিপন। রিপনও লেখালেখি করত এবং সৌখিন ফটোগ্রাফি যাকে বলে ফ্রিল্যান্সার ছিল। সে সুবাদে রিপনের সাথে অনেক নামিদামী সাংবাদিকগণের পরিচয় সখ্যতা ছিল। রিপনের মাধ্যমে তাদের সাথে আমাদের অনেকের পরিচয় এবং সখ্যতা হয়েছিল তাদের মধ্যে মানিক ভাই একজন। তিনি তখন দৈনিক ভোরের কাগজে কাজ করতেন। ঢাকার শাহবাগ এলাকায় ভোরের কাগজের অফিস ছিলো। সেই অফিসে অনেকদিন তার সাথে সময় কাটিয়েছি। আমি যখন জগন্নাথ কলেজে পড়ি এবং ধানমন্ডি ল কলেজে পড়ি তখন রিপনের মাধ্যমে তাদের সাথে আমাদের পরিচয় হয়, অনেক গুনি লেখক সাংবাদিকদের। দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকাটি সে সময়ে খুব আলোচিত ছিল, অফিস ধানমন্ডিতে। আজকের কাগজ থেকে অনেকে বের হয়ে প্রকাশ করলেন দৈনিক ভোরের কাগজ। ভোরের কাগজ প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে আলোড়ন সৃষ্টি করলো। যদিও বর্তমানে কাজী শাহেদ আহমেদের দৈনিক আজকের কাগজ প্রকাশিত হয় না এবং দৈনিক ভোরের কাগজ এখন প্রকাশিত হলেও এখন তেমন চাহিদা নেই পাঠক সমাজে। তখন দৈনিক ভোরের কাগজে “তুই রাজাকার” শিরোনামে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা যারা করেছেন তাদের ছবি কার্টুন আকারে দিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে সেই রাজাকারের কার্যকলাপ তুলে ধরতেন। তারই ধারাবাহিকতায় শেরপুরের একজন কুখ্যাত রাজাকারের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করার জন্য এসেছিলেন। “তুই রাজাকার” শিরোনামটি নেয়া হয়েছিল তখনকার সময়ে প্রখ্যাত নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের একটি নাটকে একটি টিয়া পাখি কেহ খারাপ কাজ করলে তাকে বলত “তুই রাজাকার”।
মাণিক ভাই প্রথম দিনের প্রশিক্ষণের শেষের দিকে বললেন আপনারা আগামী কাল আসার সময় ১টি বা ২টি প্রশ্ন লিখে নিয়ে আসবেন। আমি সেই সকল প্রশ্নের উত্তর দিব। পরের দিন তেমন কেহ প্রশ্ন লিখে নিয়ে না আসলেও আমি ৫টি প্রশ্ন লিখে তার হাতে দিলাম। আমাকেই আমার প্রশ্নগুলো সকলের সামনে উপস্থাপন করতে বললেন।
আমার প্রশ্নগুলো হলো-
১. বাংলাদেশের মত ছোট দেশে এত দৈনিক পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল কেন ?
২. সাংবাদিকদের সম্মানি দেয়া হয় না কেন? যদিও কয়েকটি মিডিয়া সম্মানি দেয় তাও মান সম্পন্ন নয়।
৩. সাংবাদিক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোন শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নীতিমালা নেই কেন? যে ইচ্ছে করে সেই সাংবাদিক হয়ে যায় কিভাবে?
৪. সাংবাদিকদের মধ্যে অধিকাংশই অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত তা আপনাদের জানা আছে কি না?
৫. অর্থের বিনিময়ে সাংবাদিকের কার্ড প্রদান করা হয় কেন? বিজ্ঞাপনের জন্য এত চাপ কেন ?
আমার ৫টি প্রশ্নের মধ্যে আবার প্রতিটির মধ্যে কয়েকটি প্রশ্ন মানিকভাই বললেন আপনার প্রশ্নের উত্তর এক এক করে না দিয়ে একত্রে দিচ্ছি।
তার উত্তর শুরু হলো: পত্র পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেলের অনুমতি যদি না দেয়া হয় তা হলে প্রশ্ন আসবে সরকার স্বাধীন মত প্রকাশে বাধা দিচ্ছে; অপরদিকে বিত্তবান লোকেরা তাদের অপকর্ম ঢাকার জন্য মিডিয়া যেমন- পত্রিকা, টিভি চালু করে থাকেন। একজন বড় ব্যবসায়ী একটি পত্রিকা বা টিভি’র মালিক হলে যদি অন্য কোন কারনেও অর্থাৎ তার অপকর্মের জন্য কিছু করা হলে তিনি বলবেন সাংবাদিকের উপর হস্তক্ষেপ বা হয়রানি করা হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী এবং বিত্তবান লোক সেই পথ অবলম্বন বা তার অপকর্ম আড়াল করার জন্যই মিডিয়ার অনুমতি নেন এমনকি অনেক রাজনীতিবিদও পত্রিকা, টিভির মালিক।
সাংবাদিকদের সম্মানি দিবে কি প্রায় সবাই তো এলাকায় ক্ষমতা দেখানোর জন্য বা অনৈতিক কাজ করার জন্য বা অন্য উপায়ে অর্থ উপার্জনের জন্য উল্টো অর্থ দিয়ে কার্ড নিয়ে আসে। মিডিয়াতো এখন ব্যবসা, বিজ্ঞাপন না দিলে তার ব্যবসার ক্ষতি হয়ে যাবে এবং পত্র পত্রিকা টিভি চালাতে পারবে না।
তিনি অল্প কথায় আমার সকল প্রশ্নের উত্তর দিলেন এবং আমার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হয়েছে। প্রশ্নগুলো করাতে আমাকে অনেকেই বললেন বছরের সেরা প্রশ্ন এবং সেরা উত্তর। কেহ কেহ চুপ করে বসে রইলেন। আবার অনেকেই হাসতে লাগলেন। তিনি বললেন বর্তমানে মান সম্পন্ন খবর বা লেখা প্রকাশিত না হওয়ার দরুন দিনে দিনে পাঠক সংখ্যা কমছে। বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকেই খবর আগেই পেয়ে যাচ্ছেন সেটাও একটি কারণ।
আমাদের দেশে ভালো নিরপেক্ষ মিডিয়া এবং সাংবাদিক নেই সেটা আমি মনে করি না তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে মফস্বল এলাকা গুলোতে শিক্ষিত মেধা সম্পন্ন লোক সাংবাদিকতায় খুবই কম আসছেন বিভিন্ন কারণে। কারণগুলো উল্লেখ করলে হয়ত অনেক সহকর্মীই মনক্ষুন্ন হবেন।
সাংবাদিকতা দুই-ই : একই সঙ্গে তা যেমন আর্ট আবার তা ক্র্যাফ্ট। সমাজ ও রাষ্ট্রে সাংবাদিকতার ভূমিকা কি হবে তা নিয়ে পুলিৎজারজয়ী কলামিস্ট লেখক ওয়াল্টার লিপম্যান তর্কে মেতে উঠেছিলেন, দার্শনিক জন ডিউই এর সঙ্গে, গেলো শতকের দ্বিতীয় দশকে লিপম্যান মনে করতেন এলিটদের থেকে তথ্য নিয়ে জনগণকে জানানোই সাংবাদিকতার মৌল কাজ। পক্ষান্তরে ডিউই’র যুক্তিছিল কেবল তথ্য দিলেই হবে না, সমাজ ও রাষ্ট্রের চলমান ও জটিল ঘটনার সঙ্গে জনগণকে যুক্ত করতে হবে। একশ বছর আগে যে বিতর্ক তাঁরা শুরু করেছিলেন তা শেষ হয়নি চলছে এখনও। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশুনো করেই সাংবাদিকতায় আসতে হবে, আমাদের দেশে এমনটি নয়। আবার দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় পড়াশুনা করে আসা শিক্ষার্থীরাও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে প্রথমে হোঁচট খাচ্ছে। এর কারণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিখে পড়ে আসা অনেক কিছুরই বাস্তবের সঙ্গে মিলছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সব বই পড়ানো হচ্ছে তার বেশীর ভাগই বিদেশী ও কয়েক দশকের পুড়ানো। আবার বাংলাদেশেরও প্রেক্ষাপট সেসব দেশ হতে কিছুটা ভিন্ন। আর সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তি ও চিন্তা ভাবনায় আধুনিকতার কারণে বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশে সাংবাদিক হওয়া সবচেয়ে সহজ কাজগুলোর মধ্যে একটি। অথচ সাংবাদিকতা পৃথিবীর কঠিনতম কাজগুলোর একটি। যারা সাংবাদিকতা বিষয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই এ পেশায় এসেছেন তাদের মধ্যে খুব কম মানুষকেই দেখেছি যারা এ বিষয়ে পড়াশোনা বা জানাশোনার প্রয়োজন বোধ করেন।
সাংবাদিকতা অন্যসব পেশার চেয়ে অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। একজন সাংবাদিকের দক্ষতা একজন মানুষকে ধ্বংসের মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে, আবার একজন সাংবাদিকের অজ্ঞতা একজন মানুষকে ধ্বংশ করে দিতে পারে।
বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব সাংবাদিকদের হলেও অনেক সময় সেটা করা হয় না। সাংবাদিকদের পরিচয় সাংবাদিক হওয়ারই কথা, তাদের একটি সংগঠনই থাকার কথা কিন্তু বাংলাদেশে তা নেই। জাতীয় প্রেসক্লাব থাকলেও কোন প্রেসক্লাবই তার আওতাভূক্ত নয়। কোন প্রেসক্লাবরই মাদার সংগঠন নেই। সাংবাদিকগণ আবার বিভিন্ন ভাবে বিভক্ত। কিছু কিছু রাজনৈতিক ধারায় এবং ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা ধারায় বিভক্ত। সেই বিভক্ত, ভিন্ন চিন্তাধারার জন্য সংবাদ পরিবেশন করা হয়ে থাকে যা কখনো কাম্য নয়। কারণ সাংবাদিকদের প্রধান কাজই হলো সঠিক সংবাদ পরিবেশন করা। প্রশিক্ষণের উদ্বোধনীতে পিআইবি’র মহা পরিচালক জাফর ওয়াজেদ মহোদয় যে তথ্য সংবলিত বক্তব্য দিয়েছেন তা আরো ভয়াবহ কিছু কিছু সাংবাদিকের চরিত্র আদর্শ।
সমাজের সকল সাংবাদিক ভয়াবহ তা কিন্তু নয়, আমাদের দেশের অনেক গুনী জ্ঞানী মেধাবী সাংবাদিক আছেন কিন্তু মুষ্টিমেয় কয়েকজন সাংবাদিকের জন্য অনেকেই সাংবাদিককে সাংঘাতিক বলে থাকেন। আমরা সাংঘাতিক নয়, সাংবাদিক হতে চাই। সাংঘাতিক নিপাত যাক, সাংবাদিক মুক্তি পাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!