নকলায় বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন

নকলায় বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত শ্রমিকদের মানবেতর জীবন যাপন

নকলা (শেরপুর) প্রতিনিধি:শেরপুরের নকলা উপজেলায় বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটা শুরুতেই স্থানীয় শ্রমিকের আকাল দেখা দিয়েছে। তাই বরাবরের মতো চলতি মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার শ্রমিকরা নকলায় আসা শুরু করেছেন।

২৪ এপ্রিল শনিবার রাত সাড়ে ১০ টার দিকে নকলা প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলে রাব্বী রাজনকে সাথে নিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ চত্তরের বিভিন্ন অফিসের বারান্দায় শ্রমিকরা বিছানা পেতে গাদাগাদি করে ঘুমিয়ে আছেন। কোন কোন এলাকার শ্রমিকরা বসে গল্পে মেতে আছেন। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আগত শ্রকিরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

কথা হয় জামালপুর, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, বকশিগঞ্জ, রংপুর, কুড়িগ্রাম, রৌমারী, রাজিবপুর, দাঁতভাঙ্গা, কুদালকাটি, কাউনের চরসহ বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আগত বেশ কয়েক জন শ্রমিকদের সাথে। তারা জানান, নিজেদের এলাকায় এখনও বোরো ধান কাটা শুরু হয়নি। তাই রুটি রোজগারের প্রয়োজনে কাজের সন্ধানে জেলার নকলা উপজেলায় এসেছেন।

জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার তাড়াটিয়া পুলিশ ফাড়ি এলাকার শ্রমিক ইউনুস আলী ও সাইফুল্লাহ; রৌমারীর হাফিজুর, রাজিবপুরের রহমত আলী, কুদাল কাটি এলাকার কাশেম আলীসহ অন্যান্য এলাকার অনেকে জানান, দেশে চলমান করোনা ভাইরাসের প্রভাবে লকডানের কারনে তাদের শ্রমিক মজুরি গত বছরের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বর্তমানে তাদের প্রতি দিনের মজুরি ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টা পর্যন্ত, যা গত বছর ছিলো ৬৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা। আর পানিতে পড়ে যাওয়া ধান কাটার বর্তমান শ্রমিক মজুরি ৬০০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত, আর এমন শ্রকিদের মজুরি গত বছর ছিলো ৮০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত।

করোন ভাইরাসের প্রভাবে দেশে কাজের চাপ কম থাকায় ও এই অদৃশ্য ঘাতক ভাইরাসের ভয়ে বাহিরের শ্রমিক দিয়ে কাজ করাতে ভয়ে থাকনে কৃষকরা। এমতাবস্থায় পারতপক্ষে স্থানীয় শ্রমিক পেলে বাহিরের জেলা উপজেলার শ্রমিক দিয়ে কাজ করাতে কৃষকরা রাজি নয়। তাই বাহির থেকে আসা শ্রমিকরা কাজ পেতে বেশ বিপাকে পড়তে হচ্ছে।

শ্রমিকরা সাধারনত পৌরসভার জালালপুর ম্যানেজার মার্কেট, শহরের সরকারি হাজী জালমামুদ কলেজ গেইট, কায়দা পাগলি মার্কেট, গড়ের গাঁও মোড়, গনপদ্দী বাজার, ছাল্লাতুলা নতুন বাজার, কায়দা মোড়, চেরুর বাজার, শিববাড়ি বাজারসহ বেশ কিছু শ্রমিক হাটে গিয়ে জানা গেছে পাশ্ববর্তী জেলা উপজেলা থেকে শ্রমিকরা এসে বিভিন্ন অফিস, স্কুল, কলেজ বা কোন ভবনের বারান্দায় রাত্রি যাপন করেন। তারা কিছু দিনের জন্য শ্রম বিক্রি করতে নকলাতে এসেছেন।

উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের বারান্দায় থাকা দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার তাড়াটিয়া এলাকার শ্রমিক সাইফুল্লাহ নিজের মতো করে বলেন, “আঙগর ওনু এলাও কাম শুরু অয়নাই। তাই আইন্নেগরে ওনু কামের খুজে আইছি। এনু আইয়া আমরা বিপদ পরছি। গিরস্তরা সকালে ও দুপুরে আঙরে খাবার খিলাইলেও, আইত কইরা আঙরে খাবার খিলায় না। তাতে আমরা বিপদে আছি”।

উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসে ভবনের বারান্দায় থাকা রৌমারীর হাফিজুর বলেন, “নকলার গিরস্তরা যদি আঙরে আইতের খাবার খিলাইলনি, তাইলে কাম বেশি করুন যাইত। হারা আইত উপাস থাইক্কা সকালে ওইট্টা কাম শুরু করলে শরীরে মানে না। তাতে গিরস্তগরেই কাম অয়। এইডা এনুর গিরস্তরা বুঝেনা”।

অফিসার্স ক্লাবের বারান্দায় থাকা রাজিবপুরের রহমত আলী বলেন, “আইতরে খাবার খিলাইলে কোন ক্ষতি অয়না। এইডা যদি এনুর গিরস্তরা বুঝলনি, তাইলে পরে আঙরে আইতের খাবার খিলাইলনি। এতে গিরস্তগরেই কাম বেশি অইলনি।

সমাজ সেবা অফিসের বারান্দায় থাকা কুদালকাটি এলাকার কাশেম আলীসহ অনেকে বলেন, “ এনু আঙরে বাড়ি ঘর নাই, চাইলেই কাবার খিলাবার পাইনা। আমার যে টেহা ময়না পাই এইডা থেইক্কা যদি হোটেল আইতের খাবার খিলাই তাইলেত আঙরে বাড়ি যাওয়ার সুমু কোন টেহা নিয়া যাবার পামুনা। তাই বাদ্য ওইয়াই আইত কইরা না খিলাইয়া ঘুমাইয়া পড়ি।

দূর থেকে আসা সকল শ্রমিকের দাবী- রমজাম মাসের উসিলাতে হলেও বিশেষ বিবেচনায় রাতের খাবারটা যেন কৃষকার শ্রমিকদ দেন। তাহলে কৃষকদেরই লাভ হবেন শ্রমিকরা জানান। তারা জানান, তারা সকাল সাড়ে ৬ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত কাজের চুক্তিতে কৃষকরে বাড়িতে যান। কিন্তু বিভিন্ন কারেন চুক্তির বেশি সময় প্রায়ই কাজ করতে হয়। এর পরেও কোন কৃষকরা নাকি তাদের প্রতি কোন প্রকার দয়া দেখান না। তারা বলেন, আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গাতে কাজের খোঁজে যাই, সেখানের কৃষকরা তিন বেলা খাবার দেয়। কিন্তু নকলাতেই নাকি তাদের রাতের খাবার দেওয়া হয়না। এতে করে সকল শ্রমিককে রাতে উপাস থাকতে হয়। তাই বাহির জেলা উপজেলা থেকে আসা শ্রমিকদের প্রতি একটু সহনশীল হতে পরামর্শ দিচ্ছেন সুশীলজন।

উপজেলার গনপদ্দী, নকলা, উরফা, গৌড়দ্বার, বানেশ্বরদী, পাঠাকাটা, টালকী, চরঅষ্টধর ও চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের অনেক কৃষক জানান, চলতি বোরো আবাদে তাদের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে এরই মধ্যে গরম বাতাসের কারনে অনেক এলাকার কিছু বোরো ধান চিটা হয়েছে। এর পরেও আর কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে, কৃষকার এবছর বেশ লাভবান হবেন বলে তারা জানান।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় হাইব্রিড জাতের ধান আবাদের লক্ষ মাত্রা ছিলো ৮ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে, উফশী জাতের লক্ষ মাত্রা ছিলো ৪ হাজার ৫৪০ হেক্টর জমিতে ও স্থানীয় জাতের লক্ষ মাত্রা ছিলো ৫ হেক্টর জমিতে। কিন্তু আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় তা বেড়ে হাইব্রিড জাতের ধান আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৯৭০ হেক্টর জমিতে, উফশী জাতের আবাদ কমে চাষ হয়েছে ৪ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমিতে। এবছর বোরো আবাদের চালে জাতীয় লক্ষ মাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে প্রতি হেক্টরে হাইব্রিড জাতের ধান হতে ৪.৮৫ মেট্রেকটন চাল ও উফশী জাতের ধান হতে ৪.৩২ মেট্রেকটন চাল। প্রতিবছর উপজেলায় লক্ষ্য মাত্রার চেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমেও তার ব্যাতিক্রম হবে না বলে আশা ব্যক্ত করেন উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!