ঈদে মানবিকতা ও সচেতনতার চর্চা বাড়াতে হবে

ঈদে মানবিকতা ও সচেতনতার চর্চা বাড়াতে হবে

ফিচার ডেস্ক ||সিয়াম সাধনাময় রমজানের শেষে এসেছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। গতবারের দুরাবস্থা ঠেলে এবার স্বাভাবিক সময়েরমতো ঈদ পালন করার প্রত্যাশা ছিল সবার। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ, ভারতীয় ভ্যারিয়ান্ট শনাক্ত হওয়া এবং দলবেঁধে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে গ্রামের বাড়ির দিকে ছোটা মানুষের সংখ্যা ভাবনাতীত।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা কিংবা স্বাভাবিক চিন্তা থেকেই অনুমান করা যায় সামনে হয়তো ভয়াবহ বিপদ ধেঁয়ে আসছে। সবার কল্যার্ণে তাই সচেতনতার বিকল্প নেই পাশাপাশি সমস্যায় পড়া মানুষের জন্যই মানবিক হওয়াটাও সময়ের দাবি।

ঈদুল ফিতর আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। আনন্দ এবং ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যকে ধারণ করে সর্বদা পালিত হয় এই উৎসব। ধনী-গরীবের ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে বুকে টেনে নেয়া এবং নিত্যনতুন মুখরোচক আপ্যায়ন এ দিনটিকে নতুনমাত্রায় নিয়ে যায়। ঘোরাঘুরি এবং আড্ডাবাজি তো লেগেই থাকে। পছন্দের মানুষগুলোর সাথে সবাই সময় কাটাতে নিজেকে মেলে ধরেন ভিন্ন আঙ্গিকে। দুর্ভাগ্যক্রমে, এবারের ঈদ ছাদে বেড়ানো বা ঘরে বন্দি থাকারমতো হতে যাচ্ছে।

পরিস্থিতির স্বার্থে, সুস্থতার প্রয়াসে এটাই সর্বোত্তম নিঃসন্দেহে। সচেতনতা হিসেবে এর বিকল্প নেই। স্বাভাবিকভাবে নতুন মাত্রার ইচ্ছাকে যেহেতু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বন্ধ করে দিয়েছে তাই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে যুক্ত হতে হবে আনন্দে। সংক্রমণের ঝুঁকি থাকায় প্রিয় মানুষদের হয়তো জড়িয়ে ধরা যাবে না তবে অনুভূতি, স্নেহ কিংবা মনঃস্তাত্ত্বিক ভালোবাসায় সবাইকে আমরা কাছে টেনে নিতে পারি।

অনেকে প্রিয়জনদের থেকে দূরে অবস্থান করলে ভার্চুয়ালি আনন্দে মত্ত হতে পারেন। কাছে থাকা বা পাশে থাকার তুলনায় কাজটা অনেকাংশে অনুভূতিকে সংকীর্ণ করবে সত্যি তবে ছুঁয়ে না ধরেও হৃদয়ে ধারণ করার মতো মানসিকতা থাকলে সেটা অবশ্যই নান্দনিক হবে।

প্রিয়জনের কাছে থাকার আকুতি বা তাদের প্রতি নিবেদন কতোটা তা এবারে মানুষের ঈদ যাত্রায় লক্ষ্য করা গেছে। করোনার থাবা কিংবা অনেকক্ষেত্রে মৃত্যুর হাতছানি তাদের কে দমিয়ে রাখতে পারেনি। লকডাউনের অংশ হিসেবে গণপরিবহন বন্ধ ছিল তবুও শত কষ্ট করে জীবনকে তুচ্ছ ভেবে নাড়ির টানে লাখো মানুষ পারি দিয়েছে প্রিয়জনকে দেখার মধ্যবর্তী রাস্তাটা।

সুরক্ষার অংশ হিসেবে ফেরি বন্ধ রাখা বা বিজিবি মোতায়ন কোনো কিছুই পথ রোধ করতে পারেনি ঘরমুখী এসব মানুষদের। সর্বশেষ এক প্রকার বাধ্য হয়েই সরকারকে ফেরি চালু এবং ফেরির সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এটা অবশ্যই যৌক্তিক। কেননা, যখন অধিকাংশ মানুষ সব বাঁধা বা সুরক্ষা কবজের দ্বার ভেদ করে এগিয়ে চলছে সেখানে এসব কোনভাবেই মানসই নয়। আরেকটি বিষয় হলো -বাড়ি না হয় গেলেন তবে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়ে কেনো অসচেতনতা?

সবাই অবগত যে অধিকাংশ মানুষ নূন্যতম স্বাস্থ্যবিধির ধারে কাছে নেই। তারা তাদের গতিতে, করোনাকে বোকা ভেবে চলেছে এগিয়ে৷ এখন প্রশাসনের জন্য এটাই বড় চ্যালেঞ্জ। পথ আটকানো যেহেতু যায়নি সুতরাং অন্তত পক্ষে স্বাস্থ্য বিধির বিষয়ে যেন তারা জোর দেয় এটা আমার মতামত। স্বাস্থ্যবিধি না মানাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা উচিত। বাঙালি স্বদিচ্ছায় না শিখলেও ঠেকায় পড়ে সবসময় শিখে বা মানে। এই বিষয়ে সতর্ক হলেও দ্বিতীয় ঢেউ বা আসন্ন ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট থেকে কিছুটা সতর্ক হয়তো থাকা সম্ভব। “মানবো না আমি কোন মানা “- এই নীতিতে বিশ্বাসী বাঙালি এ যাত্রায় হয়তো টিকে থাকার শেষ সময় টুকুও পাবে না! ভারতীয় দুরাবস্থা এবং বিশেষজ্ঞদের ধারণা অন্তত সে বিষয়ে ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নিজস্ব সচেতনতার বিকল্প বৃহৎ পরিসরে আর নেই আমার মতে৷ শতভাগ না হলেও একটি বড় অংশ রক্ষা পেতে পারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। মনে রাখা প্রয়োজন দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়েও ভারত নূন্যতম লড়তে পারে নাই।

আর স্বাস্থ্যখাতে এখনো আমরা অনেক পিছিয়ে। ছোট্ট এক উদাহরণ হলো পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ সংখ্যা দেশে মাত্র ১১২ টি৷ আপনার স্বাভাবিক বিবেচনা বোধ থাকলে এখনই সতর্ক হবেন এটাই আমার বিশ্বাস।

এবার আসা যাক মানবিকতার প্রসঙ্গে। ঘরবন্দি হলেও আনন্দ আয়োজন যতোটা সম্ভব আপনি জাঁকজমকপূর্ণ করবেন এটাই স্বাভাবিক। খাওয়া-দাওয়া, হৈ-হুল্লোড় কিছুতেই হয়তো থাকবে না কমতি। পোলাওয়ের জাফরানি গন্ধে ম ম করবে আপনার ঘর। হয়তো দেখা যাবে আপনার প্রতিবেশী কি খাবে সেটা নিয়েই ভাবনায় ব্যস্ত।

যেখানে অর্থাভাবে পাচ্ছে না কূলকিনারা সেখানে ভোগ-বিলাসিতা সাজে? একদমই না। কথায় আছে “গরীব খোঁজে খাদ্য, ধনী খুঁজে খিদে।” যার আছে সে চায় ভুরি ভুরি যার নেই তার একদম নেই। এমন অবস্থা ঈদের মতো বৈচিত্র্যময়, ভাতৃত্বপূর্ণ উৎসবে অবশ্যই বেমানান। প্রতিবেশীর পাশে সাধ্যমত দাঁড়ানো আপনার নৈতিক কর্তব্য। করোনার দোহাই দিয়ে দূরে থাকার পর স্বার্থপরতা দেখিয়ে বৈষম্য সৃষ্টি করবেন না দয়া করে৷

করোনায় দূরত্ব মানা জরুরি, দূরে থাকা ভালো নিশ্চয়ই। তবে, দূরে ঠেলে সরিয়ে দিতে কেউ বলেনি৷ এ দূরত্ব শারীরিক, মানসিক নয়। স্নেহ, প্রীতি কিংবা ভালোবাসায় কিছুটা দূরে থেকে নিশ্চয়ই চাইলেই পাশে থাকা যায়৷ এছাড়াও রাস্তাঘাটে অসহায় মানুষের দুমুঠো চাহিদা পূরণে ভিন্নধর্মী আয়োজন রাখতে পারেন। স্বাভাবিক জীবনে উৎসব আয়োজনে ব্যয় হওয়া অর্থ না জমিয়ে সমাজের কল্যাণের স্বার্থে অবশ্যই দান করা উচিত। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী যাকাত-সদকার মতো সময়োপযোগী বিষয়গুলো পালনের চেষ্টা করুন।

অসহায়দের সুবিধার্থে অনেক সংগঠন দৃঢ়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তাদের যথাযথ আর্থিক সাহায্য করতে পারেন কিংবা আপনার এলাকার অসহায় মানুষ সম্পর্কে অবগত করতে পারেন। সরকারি ত্রাণে তৃণমূলের কোন স্থানীয় নেতৃবৃন্দের অনিয়ম চোখে পড়লে অবশ্যই প্রশাসনকে অবহিত করার চেষ্টা করবেন। সরকারি ত্রাণ অধিকার, কারো দয়ার দান নয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই মূল্যবোধকে মাথায় রেখে বঞ্চিত মানুষের সমস্যার কথা প্রশাসনে অবহিত করা আপনার দায়িত্ববোধের পরিচয় বহন করবে নিঃসন্দেহে। মানবিকতা বা মানবিক বোধে আপনি যতো উদ্ভাসিত হবেন ততোই আপনার পাশের মানুষটির ঈদ আনন্দ পাবে পূর্ণতা, দূর হবে বৈষম্য। সত্যিকারের মানুষ হিসেবে আপনি পাবেন যথাযথ সম্মান। সামাজিক, ধর্মীয় কিংবা মানবিক বোধদয় আপনার যত বৃদ্ধি পাবে তত উৎসবের রঙ বদলাবে। ফুটে উঠবে ঈদের সত্যিকারের সৌন্দর্য।

অস্বাভাবিকতার মাঝেও অনেক সময় পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে স্বাভাবিক থাকতে হয়। সচেতনতায়, মানবিকতায় আমরা হয়ে উঠবো অনন্য, তবেই ঈদের আনন্দ বা মাহাত্ম্য হবে অসামান্য। আলোকের ধারায় আলোকিত হোক এ বসুধা, করোনা হোক পদানত৷ ঈদ বয়ে আনুক অফুরন্ত আনন্দ। শুভেচ্ছা সকলের তরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!