করোনায় পৌনে ৫ কোটি টাকা ঋণ পেলেন ১৬শ আইনজীবী, কারও কারও অসন্তোষ

করোনায় পৌনে ৫ কোটি টাকা ঋণ পেলেন ১৬শ আইনজীবী, কারও কারও অসন্তোষ

নিউজ ডেস্কঃ করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) প্রতিরোধে সরকারঘোষিত লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধের কারণে অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন অনেক আইনজীবী। এই সংকট নিরসনে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির (বার অ্যাসোসিয়েশনের) পক্ষ থেকে আপৎকালীন বিশেষ ঋণ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দেড় হাজারেরও বেশি আইনজীবী পৌনে পাঁচ কোটি টাকা পেয়েছেন। ঋণ বাবদ আইনজীবীদের প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট বার সূত্রে জানা গেছে।

তবে, অনেকে আইনজীবীদের ঋণ দেয়ার বিষয়টিকে সাধুবাদ জানালেও কেউ কেউ ভালো চোখে দেখছেন না। তারা বলছেন, এভাবে ঋণ না দিয়ে ঈদ উৎসব বা ভাতা হিসেবে বারের সব সদস্যকে কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা করে দিলে এই সংকটকালে সেটা ভালো উদ্যোগ হতো। অনেকে আবার এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতেও রাজি হননি।

করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টসহ দেশের সব আদালত কিছুদিন বন্ধ রাখার পর এখন সীমিত পরিসরে আদালতের কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ ঘোষণা করে সরকার। এরই মধ্যে পর্যায়ক্রমে বিধিনিষেধের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে।

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট বন্ধ রাখার পর আইনজীবীদের দাবির মুখে সীমিত আকারে চালু রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ধীরে ধীরে সীমিত পরিসরে হাইকোর্টের সাতটি বেঞ্চে বিচারিক কাজ চলছিল। এছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চলছিল সপ্তাহে তিন দিন এবং আপিল বিভাগের চেম্বারজজ আদালতে সপ্তাহে কয়েক কর্মদিবস বিচারিক কাজ চলছিল।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের বেশিরভাগ আইনজীবী হাইকোর্টের ভার্চুয়াল বেঞ্চ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিচারপ্রার্থীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতে এবং মামলার জট ছাড়িয়ে জনদুর্ভোগ কমাতে ভার্চুয়াল বেঞ্চ বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে আইনজীবীদের একমাত্র আয়ের পথও সুগম হবে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি সূত্রে জানা গেছে, জমানো অর্থ দিয়ে কিছু কিছু জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সংসার চললেও, অন্যান্য নবীন-প্রবীণ আইনজীবী সংসার চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তাই আইনজীবীদের মধ্য থেকে বিচ্ছিন্নভাবে দাবি ওঠে, নবীন-প্রবীণ সদস্যদের বিশেষ ঋণ দিতে হবে। এরই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরের আগে মোট চার কোটি ৮০ লাখ টাকারও বেশি ঋণ পেয়েছেন ১৬ শতাধিক আইনজীবী। এই অর্থ চেকের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল জাগো নিউজকে বলেন, ‘করোনাকালীন আইনজীবীদের আর্থিক অবস্থা বিবেচেনা করে গত বছরও আর্থিক লোন (ঋণ) দিয়েছিলাম। এবারও ঈদের আগে রোজার সময় আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে বার থেকে আইনজীবীদের পাশে দাঁড়ানো দায়িত্ব কিংবা কর্তব্য হিসেবেই নিয়েছি।থ

তিনি আরও বলেন, ‘এর আগেও বারের সেক্রেটারি ছিলাম, এবারও আছি। গতবার আইনজীবীদের আর্থিক দুর্দশা দেখেছি। এবারও আমরা দুর্দশা উপলব্ধি করেছি। তাই পৌনে পাঁচ কোটি, অর্থাৎ ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকারও বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।থ

বিশেষ ঋণের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. মোমতাজ উদ্দিন মেহেদী কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি সুপ্রিম কোর্ট বার এবং ঢাকা বারের কাছে আবেদন করেছিলাম, সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সম্পাদক হিসেবে যে, ঈদ উৎসব ভাতার নামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব আইনজীবীকে ১০ হাজার টাকা করে দিতে হবে। তাই আমি ঋণ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।থ

মোমতাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি দাবি করেছিলাম ঈদ উৎসব ভাতা দিতে, যা নন-রিফান্ডেবল এবং যা ফান্ডে অ্যাডজাস্ট হবে। আর বার দিয়েছে লোন (ঋণ)। সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনও বলেছিলেন উৎসব ভাতা দিতে।থ

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ট্রেজারার অ্যাডভোকেট ড. মো. ইকবাল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘করোনাভাইরাস রোধে লকডাউনের কারণে অনেক আইনজীবী সংকটে পড়েছেন। সুপ্রিম কোর্টও বন্ধ ছিল। ভার্চুয়ালি অনেক আইনজীবী ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারেননি। এ কারণে তাদের জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত ১৩ মে পর্যন্ত আমরা চেকের মাধ্যমে টাকা বিতরণ করেছি।থ

কোনো আইনজীবী বাকি আছেন কি-না, বা ঈদের পরও ঋণ দেয়া হবে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। ঈদের আগেই বেঁধে দেয়া সময় শেষ হয়ে গেছে। তারপরও অনেকে আবেদন নিয়ে আসছেন। তাদের অনুরোধে কমিটি টাকা দিয়েছে। এখন আরও সময় বাড়ানো হবে কি-না সেটা কমিটির বিষয়।

ঋণ দেয়ার বিষয়টিকে অনেকে সাধুবাদ জানালেও কিছু কিছু আইনজীবী মনে করছেন, ঋণ নিলে তো ফেরত দিতে হবে। তাই একটু কষ্ট করে চললেও ঋণ নিতে চাইছেন না অনেকে।

বার থেকে গত বছর এবং চলতি বছর কখনো কোনো ঋণ নেননি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঋণের বিষয়টা তো ফেরতযোগ্য। আমাদের অনেকের কাছে বিষয়টি পছন্দ হয়নি। তাই আমি ঋণ নেইনি। কারণ যেটা দিত হবে সেক্ষেত্রে আমি একটু কষ্ট করে চলবো। আসলে তো যারা ফান্ডে এক বছরের ওপরে, তারাও ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। অথচ তারা কিন্তু জমা দিয়েছেন মাত্র সাত হাজার টাকা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার মত, এভাবে ঋণ দেয়া ঠিক হয়নি। যদি উৎসবভাতা হিসেবে দিয়ে দিতো, অথবা ১০ হাজার করে জুনিয়রদের দিতো তাও চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত হতো। যেহেতু ফেরত দিতে হবে, এটা নিয়ে আসলে খুব স্যাটিসফেকশনের (সন্তোষ) কিছু নেই।

এ বিষয়ে আইনজীবী এএম জামিউল হক ফয়সাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘বার থেকে ঋণ দেয়াটা ভালো উদ্যোগ। সংকটকালে আইনজীবীদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনকে ধন্যবাদ জানাই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এরশাদ হোসেন রাশেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘বার থেকে যে ঋণ দেয়া হয়েছে। এটা অবশ্যই একটি পজিটিভ দিক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আমাদের কোর্ট খোলা ছিল না। আবার ঈদের আগে লকডাউন থাকায় পুরোপুরি বন্ধই ছিল বলা যায়। ভার্চুয়ালি যে অল্প সংখ্যক কোর্ট খোলা ছিল, সেটা মূলত আইনজীবীর তুলনায় অনেক কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!