সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণমাধ্যম বিদ্বেষ কেন বাড়ছে

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণমাধ্যম বিদ্বেষ কেন বাড়ছে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ সম্প্রতি দেশের কয়েকটি গণমাধ্যম সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ স্ট্যাটাস দেন উঠতি এক সংগীতশিল্পী। জনপ্রিয় ব্যান্ড নগর বাউলের জেমস সম্পর্কে ১৪টির মতো আপত্তিকর স্ট্যাটাস দেন তিনি। সুরকার-গীতিকার মিথুন বাবুসহ একাধিক শিল্পী সম্পর্কে করেন তীর্যক মন্তব্য। পরবর্তীতে তার ফেসবুক পেজটি হ্যাক হয়েছে বলে দাবি করেন সেই শিল্পী। যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিজের গানের পাবলিসিটি বাড়াতেই এমন কাজ করছেন নবীন এই শিল্পী।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গণমাধ্যম বিদ্বেষ চরমে উঠেছে। পত্রিকা, টেলিভিশন ও অনলাইন নিউজপোর্টালের ফেসবুক পেজের পাতায় খবরের লিংকের নিচে অপ্রাসঙ্গিক ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য থামছেই না। শুধু গণমাধ্যম নয়, গণমাধ্যম কর্মীরাও হচ্ছেন সাইবার হয়রানির শিকার। মা দিবসে মায়ের সঙ্গে একটি ছবি ফেসবুকে প্রকাশের পর ধর্ম নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের কবলে পড়েন অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। এ ছাড়া একাত্তর টিভির উপস্থাপিকা মিথিলা ফারজানাকে নিয়ে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করে ভুয়া পোর্টাল ও কয়েকটি ফেসবুক পেজ। এই তথ্যের লিংক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন অনেকে।

ধর্মীয় বক্তার বিরুদ্ধ সংবাদ করায় ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীর ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিষ্টাচার বর্জিত পোস্ট, কমেন্টস বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ জরুরি। তবে এসব ঘটনায় গণমাধ্যমের দায় আছে বলে মনে করেন তারা।

এ বিষয়ে সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা কোনো কোনো ঘটনা দ্রুত পেয়ে যাই। তবে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি এই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন, সাইবার হয়রানির শিকার হচ্ছেন। গণমাধ্যম বা ব্যক্তি বিশেষকে নিয়ে আমরা কটূক্তি, চরিত্রহনন করা তীর্যক মন্তব্য করতে দেখছি। আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ আশা করছি।

তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কোনো জবাবদিহিতা নেই। এখানে যে যার খুশি লিখে যাচ্ছেন, এতে বাধা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। ব্যক্তির স্বাধীনতা অনুযায়ী যে যা লিখে যাচ্ছেন। তবে ব্যক্তির বুলি অনেক শক্তিশালী এটাও ঠিক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অনেক শক্তিশালী একটি মাধ্যম। এটাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে এখানে ইচ্ছেমতো সবকিছু লেখা যায়, বলা যায় বিধায় মিথ্যা তথ্য ও ফেক নিউজ ছড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যার যার মোটিভ বা উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য এসব পোস্ট বা কমেন্টস করতে পারেন। এই চর্চা আমাদের সমাজের জন্য ভালোকিছু বয়ে আনবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘গণমাধ্যমের কিছু খবরে হয়তো অনেকেই রিঅ্যাকশন (প্রতিক্রিয়া) দেখান। আমরা মনে হয় গণমাধ্যম যদি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকশিত হয়, পেশাজীবত্ব অনেক বেশি গুরুত্ব পায় তাহলে সংবাদের গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। অনেক গণমাধ্যম আংশিক বা পার্শিয়াল নিউজ প্রকাশ করে। আবার উদ্দেশ্যমূলকভাবে সংবাদ প্রকাশ করে। এসব কারণে গণমাধ্যম ও গণমাধ্যম কর্মীরা বিদ্বেষের শিকার হন।

বিদ্বেষ, বিভ্রান্তি, গুজব ছড়িয়ে কারা লাভবান হয় তা খুজেঁ বের করার আহ্বান জানিয়ে গণমাধ্যমকর্মী ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ আলম খান তপু জাগো নিউজকে বলেন, ‘সংবাদ মাধ্যমের গ্রহণযোগ্যতাকে যদি টেনে ধরার অপচেষ্টা চলে তাতে সমাজের দুর্বৃত্তায়ন চক্র লাভবান হয়। এই দুর্বৃত্তরা যদি শক্তিশালী হয়ে যায় তাহলে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হবে।

তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংবাদ নিয়ে বা সংবাদের লিংকের কমেন্টসে কেউ বিদ্বেষমূলক লেখা লিখছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আর সংবাদমাধ্যমের কাজ এক না। সংবাদমাধ্যমে সম্পাদকের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে হয় গণমাধ্যমকর্মীদের। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে যা খুশি তা লিখতে পারেন। এক্ষেত্রে অনেকেই হতাশামূলক লেখা লিখে থাকেন, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হোক এ কামনা করি। ঢালাওভাবে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার সংস্কৃতি শোভনীয় নয়। এটা সমাজের জন্যও সুখকর কিছু না। গণমাধ্যমের কোনোকিছু নিয়ে যদি অভিযোগ থাকে তাহলে তারা যেকোনো প্ল্যাটফর্মে জানাতে পারেন। কিংবা সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মে জানাতে পারেন অফিশিয়ালি। তবে সেটা শোভনভাবে করা যেতে পারে। এইভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) সহকারী অধ্যাপক কামরুন নাহার জাগো নিউজকে বলেন, ‘গণমাধ্যমের বা সাংবাদিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিদ্বেষ নেই। গণমাধ্যম আসলে আস্থা হারাচ্ছে। সমাজের প্রতি প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা নিয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে গণমাধ্যম। আর বিষোদগারের ব্যাপারটিও সেই জন্যই হচ্ছে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গণমাধ্যমকে সঠিক ভূমিকা পালনের তাগিদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমকে তার সত্যিকারের ভূমিকা পালন করতে হবে। সত্যকে সত্যই বলতে হবে, মিথ্যাকে মিথ্যা। মালিকের পোষ্য হয়ে সত্য গোপন করা সাংবাদিকের কাজ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!