সাংবাদিক ফাগুন হত্যা রহস্য উন্মোচনের দাবি পিবিআইয়ের

সাংবাদিক ফাগুন হত্যা রহস্য উন্মোচনের দাবি পিবিআইয়ের

স্টাফ রিপোর্টারঃ প্রিয় ডটকমের সহসম্পাদক ও তরুণ সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের হত্যা রহস্য উন্মোচনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সংস্থাটি বলছে, ট্রেনে ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের হাতে খুন হয়েছেন ফাগুন।

তবে ফাগুনের বাবা সাংবাদিক কাকন রেজার দাবি, পরোক্ষভাবে কেউ এই হত্যাকাণ্ডে রসদ জুগিয়েছেন। ফাগুনকে হত্যার আগে তার একটা অনুসন্ধানী নিউজের কারণে হুমকি এসেছিল। ওই গোষ্ঠীও এই হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।

ছিনতাইয়ের পর হত্যার বিষয়টি রহস্যজনক দাবি করে ঘটনাটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবিও জানান তিনি।

জামালপুর রেলওয়ে থানার বহুল আলোচিত ফাগুন রেজা হত্যা মামলাটি এক বছর আট মাস পর রেলওয়ে পুলিশের কাছ থেকে পিবিআইয়ের কাছে আসে। এর চার মাসেই হত্যার কারণ উদঘাটনের দাবি করছে পিবিআই।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় জামালপুরের পিবিআই কনফারেন্স রুমে এক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এমএম সালাহ উদ্দীন জানান, মামলায় গ্রেপ্তার এক আসামি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে জবানবন্দি দিয়েছেন। আসামি জানিয়েছেন, ফাগুন হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন পাঁচ ব্যক্তি। এরা ট্রেনে সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সদস্য।

পুলিশ সুপার জানান, খাবারের সঙ্গে ঘুমের বড়ি কিংবা চেতনানাশক দ্রব্য মিশিয়ে যাত্রীদের অজ্ঞান করে টাকা-পয়সা, মোবাইলসহ মালপত্র হাতিয়ে নেয়াই এদের কাজ। সাংবাদিক ফাগুনের ক্ষেত্রেও এমনটি হয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে পুলিশ সুপার এমএম সালাহ উদ্দীন জানান, ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ময়মনসিংহের তারকান্দা এলাকার মো. সোহরাব মিয়া গাজীপুরের এক মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। তাকে ফাগুন হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য আবেদন করলে আদালত অনুমতি দেয়।

ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন তেজগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে বিবিএ প্রফেশনাল ২য় সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন। তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি সাব এডিটর হিসেবে সংবাদ মাধ্যম প্রিয় ডটকমে কর্মরত ছিলেন।

২০১৯ সালের ২১ মে বিকেল ৪টার দিকে নিজের বাড়ি শেরপুরে আসার জন্য তেজগাঁও রেলস্টেশন থেকে জামালপুরের কমিউটার ট্রেনে উঠেন ফাগুন। ওই দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে ফাগুন তার বাবাকে মোবাইলে জানান তিনি ময়মনসিংহের কাছাকাছি চলে এসেছেন। এর কিছুক্ষণ পর থেকে ফাগুনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

পরদিন জামালপুরের নান্দিনা রেলস্টেশনের কাছে রানাগাছা মধ্যপাড়া গ্রামের দক্ষিণ পাশে রেললাইনের পাশে ফাগুনের মরদেহ পাওয়া যায়। জামালপুর রেলওয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। এ ঘটনায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে জামালপুর রেলওয়ে থানায় মামলা করেন কাকন রেজা।

পিবিআই জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে আসামি সোহরাব মিয়া জানান, তিনি প্রায় চার বছর ধরে গাজীপুরের উত্তর মাওনা নয়নপুরে ভাড়া বাসায় থাকেন। তার সঙ্গে আসামি মাজহারুল ইসলাম রুমানও ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকেন। আসামি শফিক খান আন্তঃজেলা অজ্ঞান পার্টির সক্রিয় সদস্য ও ছিনতাইকারী।

শফিক খানের নেতৃত্বে সোহরাব মিয়া, মাজহারুল ইসলাম রুমান, নজরুল ও শফিকুল ইসলাম ট্রেনে ও বাসে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাবারে মিশিয়ে কৌশলে যাত্রীদের খাওয়ান। এর পর তাদের অজ্ঞান করে যাত্রীদের সঙ্গে থাকা মোবাইল, টাকা-পয়সাসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কৌশলে ছিনতাই করেন।

ঘটনার দিন বিকেল ৫টার সোহরাব, শফিক, নজরুল, রুম্মান ও শফিকুল সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গফরগাঁও রেলস্টেশনে যান। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তারা ট্রেনের একটি বগিতে উঠেন। ট্রেনে উঠার পর একজন ফাগুনকে টার্গেট করেন। ফাগুন তখন তার সিটে বসে ল্যাপটপ চালাচ্ছিলেন।

পুলিশ সুপার জানান, আসামিরা ফাগুনের পাশে বসে ভাব জমাতে থাকেন। সোহরাব, রুমান ও শফিকুল ট্রেনের দুই সিটের ফাঁকা জায়গায় বসে তাস খেলা শুরু করেন। ট্রেন ময়মনসিংহ রেলস্টেশনের কাছাকাছি আসলে তারা তাস খেলা বন্ধ করে দেন।

ময়মনসিংহ স্টেশনে ট্রেন এসে থামার পর শফিক সোহরাবকে ১০০ টাকা দিয়ে সবার জন্য কোক কিনে আনতে বলেন। সোহরাব ট্রেন থেকে নেমে প্লাটফর্মের একটি দোকান থেকে ১৫ টাকা করে ৬টি কোকের বোতল কিনে ট্রেনে উঠেন এবং একটি বোতলের মুখ খুলে তার ভেতরে ঘুমের বড়ির গুঁড়া মেশান।

ট্রেনে ওঠার পর তারা প্রত্যেকে একটা করে বোতল নেন। শফিক ঘুমের বড়ির গুঁড়া মেশানো বোতলটি ফাগুনকে দিলে তিনি রাজি হননি। পরে সবাই মিলে অনুরোধ করলে ফাগুন কোকের অর্ধেক খেয়ে রেখে দেন। রুমান সেই বোতলটি ফেলে দেন।

ময়মনসিংহ স্টেশন হতে ট্রেন ছাড়ার পর ফাগুন তার ল্যাপটপ বন্ধ করে ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখেন এবং পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বের করে কথা বলেন। আসামিরা সবাই মিলে ফাগুনের সঙ্গে গল্প করতে থাকেন।

ট্রেন বিদ্যাগঞ্জ স্টেশনে থামার পর আরও কয়েকজন যাত্রী নেমে যান। ফাগুন তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে আসামিরা তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুরোপুরি অচেতন না হওয়ায় তারা ফাগুনের সঙ্গে থাকা জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতে পারেন নি। এরই মধ্যে ট্রেন পিয়ারপুর স্টেশন হয়ে নুরুন্দি স্টেশনে এসে থামে।

আসামিরা ও ফাগুন বাদে সব যাত্রী নেমে যায়। নুরুন্দি স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার পর আসামি সোহরাব ফাগুনের পকেট থেকে কৌশলে মোবাইল নিয়ে নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.