একজন জমশেদ আলী

একজন জমশেদ আলী

জমসেদ আলী স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর অবদানের কথা শেরপুরের অনেকেই হয়তো জানেন না। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্রহাতে যুদ্ধ না করলেও মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশের জনগন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন তাদের মাঝে একজন। জমসেদ আলী শেরপুর জেলার সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নে ছয়ঘড়ি পাড়া গ্রামের এক সম্ভান্ত্র মুসলিম পরিবারে বাবা জবেদ আলী সরকার মাতা জবেদা বেগমের ঘরে জন্ম গ্রহণ করেন। তার জন্ম ১৯৩২ সালের ৬ডিসেম্বর। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার বড় বোন জায়দা বেগম (৯৫) এখনো স্বাভাবিক চলাচল করতে পারে। জি.কে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাশ করেন। তিনি বাবার সাথে রাগ করে মিয়া সাহেবের (পীর সাহেব মিয়াজি) সাথে বগুড়া চলে যান এবং কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভর্তি হন। দুই বৎসর ট্রেনিং শেষ করে টাংগাইলে চাকরিতে যোগ দেন। হঠাৎ একদিন টাংগাইলে শেরপুরের বিশিষ্ঠ্য ব্যসায়ী বাবু মঙ্গল চন্দ্র সাহার সাথে সাক্ষাত হলে তার প্রতিষ্ঠানে যোগ দানের আমন্ত্রণ জানায়। তার পর শেরপুর চলে আসেন। কিছু দিনের জন্য ড্রাইভিং পেশা বেছে নেন।পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে শেরপুর এগ্রিকালচার ইনিস্টিউটে (ATI)এ মেকানিক হিসাবে যোগ দেন। তিন পুত্র ও চার কন্যা সন্তানের জনক।তার সন্তানেরা নানা পেশায় নিয়োজিত। বড় ছেলে মোঃ আতাহার আলী দুলাল উপজেলা উপকৃষি কর্মকর্তা হিসাবে সদ্য অবসরে আছেন। দ্বিতীয় জন এস এম বেলায়েত পারভেজ ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত আছেন। তৃতীয় জন মোঃ মিনহাজউদ্দীন মিনাল সক্রিয় রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তার বিশেষ অনুপ্রেরনায় ছোট ছেলে মিনহাজ উদ্দীন মিনাল রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। মেয়েরা যার যার অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত। জমশেদ আলী একজন শ্রমিক নেতা হিসাবে শেরপুর সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব একাধিকবার দক্ষতার সাথে পালন করেছেন।সরকারি চাকরির কারণে সরাসরি রাজনীতি করতে পারেননি। তবে পাকিস্তান আমল থেকে বঙ্গবন্ধুর সকল আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। তিনি জীবন বাজি রেখে অনেক সাহসী কাজে অংশ গ্রহণ করেছন।মুক্তি যোদ্ধের শুরুতে শেরপুরের ছাত্র নেতাদের নিয়ে বর্ডার খোলার জন্য বি.এস.এফ এর নিকট নিয়ে গিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে শেরপুরের হিন্দু পরিবার গুলো কে নিরাপদে বর্ডার পার করে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে নয়আনী বাজার নিবাসী সুবীর চন্দ টিংকুর বড় বোন দিপালী চন্দ বলেন, “আমি তখন শেরপুর কলেজে ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্রী জমশেদ কাকা আমাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে সীমান্ত পার করে দিয়েছেন।” তাঁর এলাকায় তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনগনকে সংগঠিত করেছেন। শেরপুরের সাবেক এমপিএ মরহুম নিজাম উদ্দিন আহমদ এক বক্তব্যে বলেছেন- জমশেদ মিয়া সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ না করলেও একজন মুক্তিযোদ্ধা যা যা করেছে জমশেদ মিয়াও তাই করেছেন। তাঁর ছোট ছেলে মোঃ মিনহাজ উদ্দিন মিনাল শেরপুর সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জি.এস নির্বাচিত হয়েছিল (১৯৯০-৯১) শিক্ষা বর্ষে। দুই বার লছমনপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিল। মিনাল তার বাবার নামে জামশেদ আলী মেমোরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছে যা চর অঞ্চলে হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রীর প্রিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাড়িয়ে আছে কুসুমহাঁটিতে। জমশেদ আলী শিক্ষিত মানুষকে সন্মানের চোখে দেখতেন ও খুব পছন্দ করতেন। জমশেদ আলী ব্যক্তি জীবনে সৎ, সাহসী, স্পষ্টভাষী, কর্মঠ ছিলেন। তার প্রমাণ পাওয়া যায় যে তিনি চাকরির পাশাপাশি সৎ উপার্জন করতে আগ্রহী ছিলেন। শেরপুরে প্রথম ইলেকট্রনিকের দোকান প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৭২ সনে নিউ মার্কেটে (বর্তমানে ফুজি কালার ল্যাব)। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন পিয়ারা ভলকানাইজিং ওয়ার্ক সপ, পিয়ারা মাইক সার্ভিস, পিয়ারা ব্যাটারী চার্জিং স্টেশন (বর্তমান Rich man এর নীচে)। ১৯৮০ সালে গ্রামের বাড়িতে মেসার্স মিনহাজ রাইছ এন্ড ফ্লাওয়ার মিলস প্রতিষ্ঠা করেন। এই ক্ষুদ্র প্রয়াসগুলো তার জীবনে সফলতা আনতে পেরেছে কি না জানি না তবে আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটিকে নিঃশর্ত সমর্থন দিয়েছেন তাঁর স্ত্রী আছিয়া খাতুন। তিনি ১৯৯৭ সালে ২৫ মার্চ মৃত্যু বরণ করেন এবং তাঁর স্ত্রী আছিয়া খানতুন ২০১৭ সালের ৩ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!