সুনামই হচ্ছে আপনার সর্বস্ব  ড. মীজানুর রহমান 

সুনামই হচ্ছে আপনার সর্বস্ব ড. মীজানুর রহমান 

“গলাধঃকরণ ক্ষমতার চেয়ে কামড় বড় হওয়া উচিত নয়

আধুনিক মার্কেটিং শাস্ত্রে পারসনকে(ঢ়বৎংড়হ) পণ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়। পণ্যের দশটি অস্তিত্বের একটি হচ্ছে ‘পারসনথ । মানুষকে পণ্য বলতে যাদের সংকোচ ছিল, পন্যের বিভিন্ন নামকরণের মাধ্যমে মানুষকে পণ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টা জায়েজ হয়ে গেছে। পণ্য হচ্ছে সমস্যার ‘সমাধানথ। এটাকে বলা হয় ‘টোটাল অফারিংথ । আজকাল বলা হচ্ছে পণ্য হচ্ছে ‘এক্সপেরিয়েন্সথ বা অভিজ্ঞতা। কর্পোরেট ব্র্যান্ড এবং পার্সোনাল ব্র্যান্ডের মধ্যে অনেক দিক থেকেই মিল রয়েছে। পার্সোনাল ব্র্যান্ড হচ্ছে- আপনি কে? আপনার অবস্থান কি? আপনি কী মূল্যবোধ(াধষঁব) ধারণ করেন? এবং কিভাবে আপনি আপনার মূল্যবোধকে প্রকাশ করেন? কোম্পানি যেমনটি তার প্রতিযোগী কোম্পানির বিপরীতে তার কোম্পানির ভ্যালু পজিশনকে তুলে ধরার জন্য ব্র্যান্ডকে ব্যবহার করে, পার্সোনাল ব্র্যান্ডও ব্যক্তির জন্য একই কাজ করে। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং ক্লায়েন্টের নিকট ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিচিতি তুলে ধরতে সাহায্য করে। প্রত্যেক মানুষের নিজের একটা গল্প থাকে; লক্ষ্য, নৈপুণ্য এবং পারিপার্শ্বিকতা থাকে। যার কারনে বলা হয়, “ঢ়বৎংড়হধষ নৎধহফরহম রং ড়হবথং ংঃড়ৎুচ্। সাইবার যুগে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং ‘থাকা ভালোথ, তার চেয়ে বেশি হচ্ছে, এটা এখন ‘প্রত্যাশিতথ।

পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং শুরুটা হবে নিজের জন্য একটা কোটর বা কুলুঙ্গি (ঘরপযব) খুঁজে বের করার মধ্য দিয়ে। ঘরপযব শব্দটি স্থপতিরা এবং প্রত্নতাত্ত্বিকরা বেশি ব্যবহার করেন। ঘরপযব হচ্ছে দেয়ালের ওই ফোকর যেখানে চড়ুই পাখি বাসা তৈরি করে। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটা শুরু করতে হবে হরংযবসধহংযরঢ় থেকে। ঘরপযবসধহংযরঢ় এর মূলে থাকে বিশেষীকরণ । এমন ক্ষেত্র নির্বাচন করতে হবে যেখানে আপনার বিশেষজ্ঞ যোগ্যতা আপনার পরিমণ্ডলের ৯০ শতাংশ মানুষের চেয়ে বেশি হবে। যদি দেখেন আপনার মধ্যে এমন কোনো যোগ্যতাই নেই, তাহলে আপাতত ব্র্যান্ড হওয়ার দরকার নেই, বাল্ক (নঁষশ) হিসেবেই নিজকে বিক্রির চেষ্টা করুন। বাজারে এখনো বেশিরভাগ পণ্যেই বাল্ক (খোলা সয়াবিন তেল) হিসেবে বিক্রি হয়। এ সময়ে অন্তত একটি বিষয়ে হলেও বিশিষ্টতা অর্জনের চেষ্টা করুন। আপনি যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন, সেটা অন্যকে করতে দিন।

বিজ্ঞাপন

কেউ কেউ মনে করেন বড় পরিসরে ছোট অবস্থানে থাকার চেয়ে, ছোট পরিসরে বড় অবস্থানে থেকে প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারলে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং সহজ হয়। তাই হয়তো আমাদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেখা যায় অনেকে বড় দলের কর্মী বা ছোট নেতা হওয়ার চেয়ে, ছোট দলের বা নিজের সৃষ্ট দলের বড় নেতা হওয়াকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। রাজনীতিতে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের এটি একটি অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। এ দিয়ে রাজনীতিতে বেশি দূর এগোনো যায় না। তবে এই প্রক্রিয়ায় পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত ফল অর্জন করা না গেলেও কিছু লক্ষ্য অর্জিত হয়। যেমন ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস ব্যাপক হারে বাড়ে; তবে ‘ংযধৎব ড়ভ সরহফথ বাড়লেও ‘ংযধৎব ড়ভ যবধৎঃথ বাড়ে না। যার ফলাফল দেখা যায় জাতীয় নির্বাচনে। অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন হলেও তাঁদের জামানত থাকে না বা থাকবে না । মান্না , সাকী, নুরু, ইব্রাহিম, রতন, মাহী, পার্থ এ ধরনের ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেসের উদাহরণ। ‘ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেসকেথ ‘ব্র্যান্ড ইকুইটিতে'(ভোটার) পরিণত করার আরো অনেক পথ বাকী থাকে। আর সেই পথ অতটা সহজও নয়। অনেক বেশি লোককে প্রভাবিত করা এবং পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনা যদি রাজনীতি লক্ষ্য হয়, তাহলে বড় দলের ভিতর থেকেই পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটি করতে হবে। যথাযথ ব্র্যান্ডিং করতে পারলে বড় দলেও আপনি প্রভাবশালী (মাস্তান নয়) হয়ে উঠতে পারেন। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং হচ্ছেন পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রভাবশালী হওয়ার অতি নিকটতম সফল উদাহরণ।

নিজের ব্যক্তিত্বকে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করুন। ‘ব্যক্তিত্বথ শব্দটার ভুল ব্যবহার দেখতে পাই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে। যেমন আমরা প্রায়ই বলে থাকি, কিছু লোকের ব্যক্তিত্ব নাই এবং এদেরকে ব্যক্তিত্বহীন বলে গালি দেই। আসলে ব্যক্তিত্বহীন কোনো মানুষ হয় না। যে সকল কারণে আমরা কাউকে ব্যক্তিত্বহীন বলছি এইসব কারণগুলোর যোগফলই হচ্ছে ব্যক্তিত্বহীন ব্যক্তিটির ব্যক্তিত্ব। আমেরিকান মনোবিজ্ঞান সমিতির সংজ্ঞা অনুযায়ী, “ঢ়বৎংড়হধষরঃু ৎবভবৎং ঃড় রহফরারফঁধষ ফরভভবৎবহপবং রহ পযধৎধপঃবৎরংঃরপং, ঢ়ধঃঃবৎহং ড়ভ ঃযরহশরহম ধহফ ভববষরহম ধহফ নবযধারড়ৎচ্। অর্থাৎ আমি যে আমি, আপনি যে আপনি, আমি যে আপনি না, বা আপনি যে আমি না; এটাই আপনার-আমার ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্বকে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে আপনার নিজের ভিতরের স্বাতন্ত্র্যটি আপনাকে চিহ্নিত করতে হবে, যার কারণে অন্যদের তুলনায় সমাজ আপনাকে আলাদাভাবে দেখে। আপনার কাজ হচ্ছে অন্যদের মনে আপনার স্বাতন্ত্র্য অবস্থানটির কারণ জানা। ধরা যাক, আপনি একজন জনপ্রিয় কবি। ‘ছন্দের বিশুদ্ধতাইথ কবিদের ভিড়ের মধ্যে আপনার এই জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ। তাহলে আপনাকে আপনার পরবর্তী কবিতায় ছন্দের উপর আরো বেশি জোর দিতে হবে। এই অবস্থায় অষ জরবং এবং ঔধপশ ঞৎড়ঁঃ নিজের বর্তমান অবস্থানটাকে জোরালো করতে পরামর্শ দিয়েছেন ( ঃড় ংঃৎবহমঃযবহ রঃং ড়হি পঁৎৎবহঃ ঢ়ড়ংরঃরড়হ )। এটাকে ডিফেন্স স্ট্র্যাটিজি হিসেবে বিবেচনা করলেও ক্ষতি নেই । ধরুন, ফুটবল খেলায় আপনার দল ফাস্ট হাফে ২-০ গোলে এগিয়ে আছে, অর্থাৎ ভালো অবস্থানে আছে এবং এই ভালো অবস্থানের কারণ হচ্ছে- ‘গোলথ। এটাকে প্রোটেক্ট করার সবচেয়ে ভাল বুদ্ধি হচ্ছে সেকেন্ড হাফের শুরুতেই আরও গোল করা। এটাকে বলা হয় পজিশন ডিফেন্স (ঢ়ড়ংরঃরড়হ ফবভবহংব)। ছোটবেলায় ফুটবল খেলার সময় আমরা এই কাজটা করতাম। প্রথম হাফে এগিয়ে থাকলে দ্বিতীয় হাফে ডিফেন্সিভ খেলতাম। এত জোরে হাই কিক দিতাম বল গিয়ে স্কুলের পাশে বাঁশঝাড়ের মাথায় গিয়ে পড়তো। যেহেতু বল একটাই থাকতো (খড়ের গোল্লা অথবা জাম্বুরাকে বাদ দিলে), বল বাঁশঝাড়ের উপর থেকে নামিয়ে আনতে ১০/১২ মিনিট সময় লেগে যেত। এরপর হয়তো আরেকটা কিক মেরে বল পার্শ্ববর্তী পুকুরের মাঝখানে ফেলে দিতাম । এতে দুটি লাভ, একদিকে সময়ক্ষেপন হত এবং অন্যদিকে ভিজে যাওয়ার কারণে বলের ওজন বেড়ে যাওয়ায় বলের গতি কমে যেত। আমাদের সময়ে ফুটবল খেলার কোন নির্দিষ্ট টাইম লিমিট (মিনিট) ছিলো না । আমাদের ছোটবেলায় গ্রামে ছাত্ররা কেউ ঘড়ি পড়তো না। গ্রামে ছাত্রদের মধ্যে কেউ ঘড়ি বা চশমা পড়লে অনেকেই তাকে “ফুটানি দেখাচ্ছেচ্ বলে ঠাট্টা করত। পড়ন্ত বেলায় শুরু করতাম আর মাগরিবের আজান পর্যন্ত খেলতাম। বর্ষার দিনে ফুটবল খেলা শেষে লাফ দিয়ে পুকুরে পড়ার আগে কোথাও দাঁড়িয়ে থাকলে আমাদেরকে ভাস্কর্যের মতো দেখা যেত। একমাত্র গোলকিপারই কোন নির্দিষ্ট অবস্থানে অর্থাৎ গোলপোস্টের আশেপাশে থাকত, বাকি সবাই বলের পিছনে দৌড়াতাম। একবার আমাদের স্কুলে পাশের স্কুল থেকে বদলি হয়ে (ঞঈ নিয়ে) ‘অমূল্যথ নামে এক ছাত্র আসলো। প্রথম দিনেই অমূল্য ক্লাসে স্যারের সাথে পরিচিত হওয়ার সময় বলল, চ্ আমি আমার আগের স্কুলে ফুটবল টিমে সেন্টার ফরওয়ার্ডে খেলতামচ্। সম্ভবত নবাগত অমূল্য আমাদের ফুটবল টিমের সেন্টার ফরওয়ার্ডের অবস্থানটা পেতে চেয়েছিল। একথা শুনে আমাদের শ্রেণি শিক্ষক সাধন ভৌমিক স্যার বলেছিলেন, “তোদের আবার সেন্টার ফরওয়ার্ড ! তোরা তো বল যেখানে সবাই সেখানেচ্।

বিজ্ঞাপন

পুরো মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে গোল দেয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। আপনাকে মাঠে একটা অবস্থান নিতেই হবে। অন্তদর্শন(রহঃৎড়ংঢ়বপঃরড়হ) পদ্ধতিতে আপনার সফলতা ও দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন- কোন ক্ষেত্রে কাজ করলে আমি অন্যের চেয়ে ভাল করব? আমি কী দ্বারা উদ্বুদ্ধ হই ? কি কারণে অন্যরা আমাকে সৌজন্যে দেখায়? কোন কাজের সময় অন্যরা আমাকে সহযোগিতা করবে? কোন কাজে আমার শক্তির অপচয় হবে? কোন কাজে আমি বেশি সময় দিতে পারবো এবং ক্লান্ত হবোনা ?(ঝবধহ এৎবংয;২০১৭)। আপনি নিজে এ সকল প্রশ্নের উত্তরের ব্যাপারে নিশ্চিত না হতে পারলে বন্ধুবান্ধব, পরিবারের সদস্য অথবা সহকর্মীদের সাহায্য নিন। তাঁদেরকে বলুন উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর আলোকে আপনাকে বর্ণনা করতে। যখনই আপনি আপনার ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন তখনই এগুলোকে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য ব্যবহার করবেন। আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কেবল আজকের আপনিই প্রতিফলিত হবেন না। আপনি কোথায় যেতে চান তার রোডম্যাপও এতে থাকবে। আপনার বর্তমান সবলতা এবং দুর্বলতার বাইরেও ভবিষ্যতে আপনি যেখানে যেতে চান সেই পথপরিক্রমায় আপনার সফলতা ও দূর্বলতাগুলো বিশ্লেষণ করুন। তাহলেই আপনার আপনি আপনার ইপ্সিত লক্ষ্যে ধাবিত হওয়ার জন্য যে জ্ঞান দরকার তা অর্জন করতে পারবেন।

সুনামই হচ্ছে আপনার সর্বস্ব:
আপনি সবার নিকট আবেদনময়ী হতে চাইলে কারো নিকট সেটা না হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ হচ্ছে একটা ক্ষুদ্র অংশেই প্রথমে মনোনিবেশ করা। যে অংশ এখনো কিছুটা দৃষ্টির আড়ালে আছে এমন অডিয়েন্সকে ফোকাস করা। যে পথে প্রতিযোগিতা কম সেই পথ ধরেই এগুতে থাকুন। অনেকের ভুল ধারণা আছে অডিয়েন্সের ক্ষুদ্র অংশে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে তাঁর প্রভাবের আওতা কমে যাবে। ছোট অডিয়েন্সকে সন্তুষ্ট করার মাধ্যমেই বড় অডিয়েন্সকে জয়ের জন্য ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ানোর অনুশীলন হয়। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের চূড়ান্ত ধাপে “সুপারস্টারের” পরিণত হওয়ার আগে আপনাকে অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হবে (ঊষরুধনবঃয ঐধৎৎ ধহফ ড়ঃযবৎং , “ঞযব ঠরংরনষব ঊীঢ়বৎঃ”, ২০১৪)। প্রথম ধাপটি হচ্ছে ঘরোয়া বিশেষজ্ঞ (জবংরফবহঃ ঊীঢ়বৎঃ) হওয়া। আপনি যেখানে কাজ করেন সেই প্রতিষ্ঠানের আপনার অবস্থান সুদৃঢ় করা থেকেই শুরু করতে হবে। যদি খ্যাতিমান অধ্যাপক হতে চান তাহলে শুরুটা করতে হবে আপনি যে বিভাগে শিক্ষকতা করছেন সেই বিভাগের শিক্ষার্থী এবং সহকর্মীদের মধ্যে আপনার বিশেষত্ব দিয়ে সর্বোচ্চ স্থান দখল করার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় স্তরটিকে বলা হয় স্থানীয় হিরো(খড়পধষ ঐবৎড়ং) । আপনি আপনার নিজস্ব চাকরিস্থলের বাইরে কথা ও লেখার মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করবেন। তৃতীয় পর্যায় হচ্ছে উদীয়মান স্টারে(জরংরহম ঝঃধৎং) পরিণত হওয়া । তখন মোটামুটি সবাই আপনাকে চিনে যাবে। চতুর্থ পর্যাযটা হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি রক স্টারে (ওহফঁংঃৎু জড়পশ ঝঃধৎং) পরিণত হওয়া। আপনার খ্যাতি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। সর্বশেষ চূড়াটি হচ্ছে বৈশ্বিক সুপারস্টারে(এষড়হধষ ঝঁঢ়বৎ ঝঃধৎং) পরিণত হওয়া। তখন আপনি আপনার নির্দিষ্ট গণ্ডি(হরপযব) থেকে বেরিয়ে যাবেন। আপনি তখন আপনার নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে সম্মান পাবেন। শিক্ষক হিসেবে আপনি দৃশ্যমান এক্সপার্ট হতে চাইলে বই না লিখে কোন উপায় নেই। বই না লিখে খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন অথবা দৃশ্যমান বিশেষজ্ঞ হয়েছেন এমন দৃষ্টান্ত কম। আপনাকে পাবলিক বক্তৃতায়ও পারদর্শী হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

(এক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হচ্ছেন আমাদের জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যার। স্যার জীবনে তেমন কিছু লিখেননি, ভালো বক্তৃতাও দেননি। স্যার তাঁর ছাত্রদের নিয়মিত ক্লাস নিয়ে বিমোহিত করেছেন এমনটিও ঘটেনি। রাজ্জাক স্যারের ব্র্যান্ডে (জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া) পরিণত হওয়া অনেকটাই তাঁর ব্যক্তিগত পড়াশোনা এবং উইজডম নির্ভর। স্যারের উজডম প্রকাশের একমাত্র বাহন ছিল অন্যের (সরদার ফজলুল করিম, আহমদ ছফা…) সাথে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা। জ্ঞান সাধক আব্দুর রাজ্জাক গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিস (৪১৩-৩২৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) এর মতোই ছিলেন অনেকটা। এই মহান দার্শনিকের জীবন ছিল বিচিত্র। আজও তাঁর গোটা জীবনটাই রূপ কাহিনীর মত। ডায়োজিনিস গ্রিকবাসীদের জ্ঞানের কথা শুনিয়েছেন। তবে কিছু লিখে যান নি। কথিত আছে ডায়োজিনিস সারা জীবন একটি পরিত্যক্ত চুঙ্গীর মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। বিয়ে-শাদী করেননি। এই সময় তার একমাত্র সম্পত্তি ছিল পানি খাওয়ার একটি মগ। তাও একদিন তিনি ভেঙে ফেললেন, যখন দেখলেন তার চুঙ্গীর পাশেই একদল ছেলে হাতে নিয়ে (আঁজলা ভরে) জল খাচ্ছে, তখন তিনি তাঁর একমাত্র সম্বল মাটির প্রিয় মগটি ভেঙ্গে ফেলে জগতের যাবতীয় বস্তু থেকে মুক্ত হন, সত্যিকারের নিঃস্বে পরিণত হোন। মহাবীর আলেকজান্ডার একদিন তাঁর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন এবং জানতে চাইলেন, ‘আমি কি আপনার কোন উপকার করতে পারি?” তখন ডায়োজিনিস চুঙ্গীর পাশে সকালের রোদ পোহাচ্ছিল। ডায়োজিনিস সম্রাটের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বললেন, “আপনি আমার সামনে দাঁড়িয়ে সকালের রোদটুকু আটকে রেখেছেন। সরে গিয়ে রোদটা ছেড়ে দিতে পারেন , তাতেই আমার উপকার হয়”।)

ডায়োজিনিসের যুগ শেষ হয়েছে আড়াই হাজার বছর আগে, রাজ্জাক স্যার এর দিনও শেষ। এখন ব্র্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে নানা মাধ্যমে নিয়মিত লিখতে এবং বলতে হবে। বেশিরভাগ দৃশ্যমান বিশেষজ্ঞরা কেউ আপনার চেয়ে অনেক বেশি আলাদা নয়। অনেকেই (১০০০ বিশেষজ্ঞ ও তাঁদের সেবা ক্রেতাদের সাক্ষাৎকারে দেখা গেছে , ঞযব ঠরংরনষব ঊীঢ়বৎঃ, ২০১৪) স্বীকার করেছেন তাঁরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জ্ঞানী অথবা স্মার্ট ব্যক্তি, তা নন। কেহই লেখক বা বক্তা হয়ে জন্মাননি, কেউই অস্বাভাবিক কোনো কারিশমা নিয়েও জন্মাননি। তাঁরা কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে পার্সোনাল ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছেন, নিজের ব্র্যান্ড নিজেই তৈরি করেছেন। বেশিরভাগ লোকেই ‘ঃৎরধষ ধহফ বৎৎড়ৎ’ পদ্ধতিতে শিক্ষা গ্রহণ করেই এগিয়েছেন। প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন পথে তাঁদের নিজস্ব কৌশল ব্যবহার করে বহু দূর এগিয়েছে।

সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব নয়। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের ক্ষেত্রে এটা একেবারেই বাস্তবসম্মত নয়। অষ জরবং ঔধপশ ঞৎড়ঁঃ এই কৌশলের নাম দিয়েছেন, ‘একটি খালি জায়গা দখল করা’ (ঃড় মৎধন ধহ ঁহড়পপঁঢ়রবফ ঢ়ড়ংরঃরড়হ)। অর্থাৎ ভিড়ের মধ্যে না যাওয়া। আমার লেখা “সংকটে মার্কেটিং” বইয়ে সুন্দরী মহিলাদের জন্য একটা উপদেশ রেখেছিলাম, যারা অনেক কষ্ট করে সেজেগুজে বিয়ে বাড়িতে যান তাঁদের জন্য পরামর্শ ছিল, “কখনোই কনের মঞ্চে গিয়ে বসবেন না”। কনের মঞ্চে সুন্দরীদের ভিড় থাকে । তাছাড়া ঐদিন সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে কনের প্রতি। কেউ আপনার দিকে তাকাবে না । আপনার কষ্ট করে সাজগোজ করার কোন মূল্যই পাবেন না। বিয়ে বাড়িতে গিয়ে এমন জায়গায় বসবেন যেখানে আর কোনো সুন্দরী নেই। সম্ভব হলে পুরুষদের বসার জন্য নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে বসে পড়ুন,যেখানে আপনিই হবেন একমাত্র মহিলা, সবাই আপনাকেই দেখবে।

পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ে পথে যাত্রা শুরুর আগেই ঠিক করতে হবে আপনি কাদের নিকট পৌঁছাতে চান। অডিয়েন্স যত দ্রুত নিশ্চিত করা যাবে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং এর গল্পটিও তত দ্রুত তৈরি করতে পারবেন । অডিয়েন্স নির্বাচনের পরেই আপনি বুঝতে পারবেন কি গল্প বলতে হবে এবং কোথায় বলতে হবে। আপনার লক্ষ্য যদি হয় আরো বড় চাকরি পাওয়া তাহলে অবশ্যই আপনাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে খরহশবফওহ -এ আপনার প্রোফাইল সংযুক্ত করতে হবে এবং অনবরত আপডেট দিতে হবে। আমেরিকায় ৯২ শতাংশ নিয়োগকারী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে উচ্চমানের প্রার্থী খুঁজে; এরমধ্যে ৮৭ শতাংশ এ কাজে খরহশবফওহ ব্যবহার করে। আপনি যদি গ্রাফিক ডিজাইনার বা চিত্রশিল্পী হন তাহলে নিজের একটা ওয়েবসাইট খুলুন(ঝবধহ এৎবংয,২০১৭)। মৌলিক বাজারজাতকরণের সমন্বিত যোগাযোগ (ওগঈ) পদ্ধতি তৈরিরও প্রথম ধাপ হচ্ছে অডিয়েন্স শনাক্তকরণ । এই কাজটি সঠিকভাবে করতে পারলে পরবর্তী ধাপগুলো অনেক সহজ হয়ে যায়। শুধু অডিয়েন্স নির্বাচন করলেই হবে না। তাঁদের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে। বিশেষ করে তাদের কমিউনিকেশন গ্রহণের এবিলিটি বা সামর্থ্য, যেটা অনেকাংশেই তাঁদের শিক্ষাগত যোগ্যতার উপর নির্ভর করে। তাঁদের লিসনিং বা মিডিয়া বিহেভিয়ার অর্থাৎ তাঁরা কোন মিডিয়াতে কত সময় ব্যয় করে, কোন্ সময়টা ব্যয় করে এবং কী ধরনের বাহন (সংগীত, নাটক, সিনেমা, টকশো, খেলাধুলা…) তাঁরা পছন্দ করে।

আপনি যে ক্ষেত্রে পার্সোনাল ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চান সে ক্ষেত্রের নেতাকে খুঁজে বের করুন। তবে তাঁকে হুবহু অনুকরণ করবেন না। সফল লোকদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করুন। তাঁদের ইমিটেড (রসরঃধঃব) করে তাঁদের চেয়ে ভালো কিছু একটা করার চেষ্টা করুন। পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে আপনি মইয়ের ওপরে উঠবেন, তার জন্য যারা ইতোমধ্যেই ওখানে আছে তাদের ইনভেন্টরি তৈরি করুন। আপনার অঙ্গনের নেতৃস্থানীয়দের সাথে অনানুষ্ঠানিকভাবে মিশতে চেষ্টা করুন। আপনার ইপ্সিত ক্ষেত্র সম্পর্কে আরও তথ্য জানার জন্য চেষ্টা করুন এবং নেতৃস্থানীয়দের নিকট জানতে চান(ঝবধহ এৎবংয;২০১৭)- কিভাবে আপনি এই পর্যন্ত এলেন? প্রথম থেকে শুরু করতে বললে আপনি এখন কি কি পদক্ষেপ নিবেন? এই শিল্পের ভবিষ্যৎ কী? আপনি কিভাবে সব কিছুর খবর রাখেন এবং আপ-টু- ডেট থাকেন? কোন পেশাদারী প্রতিষ্ঠান আছে কি যেখানে আমি যোগ দিতে পারি? এ ধরনের তথ্যভিত্তিক ইন্টারভিউয়ের মধ্য দিয়ে আপনার অঙ্গনের লিডাররাও আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে অনুমান করতে পারবেন, যা পরবর্তীতে আপনার কাজে আসতে পারে।

বাণিজ্যিক পণ্যের ব্র্যান্ডিংয়ের মতই আপনি নিজের জন্য একটি ইউনিক সেলিং প্রপোজিশন(টঝচ) তৈরি করুন। যেমনটি বলেছেন আমেরিকার নর্থ ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর গ্লোবাল ব্র্যান্ডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ঋৎধহশ ঈঁঃরঃঃধ, যিনি দীর্ঘদিন যাবত পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং কোর্সটি পড়াচ্ছেন, “ুড়ঁ হববফ ঃড় পড়সব ঁঢ় রিঃয াবৎু ংযড়ৎঃ, পড়হপরংব ঃযরহমং ঃড় ংধু – ংঃড়ৎরবং ঃড় ঃবষষ- ঃযধঃ ভৎধসব ুড়ঁৎ ধঃঃৎরনঁঃবং রহ ঃযব ৎরমযঃ ষরমযঃ”. যতটা পারেন নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করুন, মানুষের সাথে আপনার সম্পর্ক যত বাড়বে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং ততবেশি স্বীকৃতি পাবে । আমেরিকায় বেশিরভাগ চাকরিই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পূরণ হয়। আমাদের দেশেও কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডে প্রায় একই অবস্থা, অন্তত উচ্চ পথগুলোতে। আপনার ব্র্যান্ড ইকুইটি বাড়ানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ইভেন্টগুলিতে অংশগ্রহণ করুন। অংশগ্রহণকারীদের সাথে মেলামেশা ও তথ্যভিত্তিক সংলাপে লজ্জা বোধ করবেন না। অন্যদের আপনার সম্পর্কে বলতে বলুন, যারা আপনাকে জানে। সোশ্যাল মিডিয়াতে সেটা সহজেই করা যায়। সুপারিশ ফরমে আপনার কর্মকাণ্ডের একটা রিভিউ পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের উপাদান হিসেবে সংযুক্ত করতে পারেন। সাইবার জগতে আপনার উপস্থিতি বাড়ান।

পেশাদার এবং কর্পোরেট চাকরিজীবীদের জন্য খরহশবফওহ হচ্ছে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডকে সমৃদ্ধ করার প্রধানতম সামাজিক মাধ্যম। আপনার কর্ম নৈপুণ্য, অর্জনের সংখ্যা, আপনার কর্মকাণ্ডের প্রোফাইল, এবং পেশাধারী ফটো খরহশবফওহ এ আপডেট করুন। এই কাজে অনেকে টুইটারও ব্যবহার করে এবং পার্সোনাল ওয়েবসাইট বা পোর্টফোলিও তৈরি করে। তবে মনে রাখতে হবে আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং কেবল অনলাইনে সীমাবদ্ধ নয়, আপনার পরিবার, অফিস, দৈনন্দিন চালচলন, মেলামেশা ও বেশ-ভূষাও আপনার পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ। ” সুনামই হচ্ছে আপনার সর্বস্ব” ।

পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য আপনি যা কিছু করবেন তা হতে হবে অথেন্টিক এবং নির্ভরযোগ্য(পৎবফরনষব)। ব্যক্তির বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়া তিনটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে- বিশেষজ্ঞতা(বীঢ়বৎঃরংব), বিশ্বস্ততা (ঃৎঁংঃড়িৎঃযরহবংং) এবং পছন্দনীয়তা (ষরশধনরষরঃু)। অথেন্টিক এবং স্বীকৃত বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভের চেষ্টা করতে হলে, নির্দিষ্ট বিষয়ে আর্টিকেল লিখতে হবে, ব্লগিং এবং বিভিন্ন গ্রুপের সাথে যুক্ত হয়ে তাঁদের সাথে কথা বলতে হবে। অডিয়েন্সের প্রতি সহযোগিতামূলক অ্যাপ্রোচ দেখালেই অডিয়েন্স আপনার প্রতি আকৃষ্ট হবে। আপনি তাঁদের জীবনে মূল্যবান হয়ে উঠবেন। আপনার বলনে এবং চলনে সামঞ্জস্য থাকতে হবে তাহলেই আপনার বক্তব্য বিশ্বস্ততার মাপকাঠিতে উতরে যাবে। আপনি যা বিশ্বাস করেন না বা ধারণ করেন না তা বললে কেউ বিশ্বাস করবে না। আপনাকে প্রচুর লোকের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করতে হবে, তাহলেই আপনি যা বলবেন তা সহজেই প্রচার পাবে এবং বিশেষজ্ঞতা , বিশ্বস্ততা এবং পছন্দনীয়তার সংমিশ্রণে সমাজে আপনার ক্রেডিবিলিটি তৈরি হবে।

অনেকে পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংকে কেবলমাত্র বিখ্যাত হওয়ার উপায় হিসেবে দেখে। জীবন থেকে আপনি কী পেতে চান আপনার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যকে সে অনুযায়ী নির্মাণ করবেন (ঔরস ঔড়ংবঢ়য;২০১৪)। কেবল বিখ্যাত হওয়া নয়, জীবনে যা কিছু করতে চান তা করে কেবল সফল হওয়াই নয়, একটি সার্থক জীবনও পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংয়ের লক্ষ্য হওয়া উচিত। সফল এবং সার্থক জীবনের অধিকারীরা পরবরর্তীতে সকলের নিকট বেঞ্চমার্ক (ইবহপযসধৎশ) হয়ে থাকেন। (চলবে)

লেখক : অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক ভিসি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!