আমার দেখা রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল||যেতে চাই কাতার বিশ্বকাপে-সত্যবয়ান

আমার দেখা রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবল||যেতে চাই কাতার বিশ্বকাপে-সত্যবয়ান

মানিক দত্ত: যাব রাশিয়া দেখবো বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা। সেটা ছয়মাস আগেই নির্ধারিত হয়েছিল। কারণ ছয় মাস পূবেই খেলা দেখার টিকিটের আবেদন করতে হয়েছিল। এবং আবেদনের ২দিন পরই এসএমএস পাই আমার টিকিট বরাদ্ধ হয়েছে তার নিশ্চয়তা। এর পরই হলো ঋঅঘ ওউ কার্ডের জন্য আবেদন অর্থাৎ সেই হলো রাশিয়া যাওয়ার ভিসা। আবেদনের এসএমএস পেলাম আমার ঋঅঘ ওউ হয়েছে। ওই নাম্বার সহ নিশ্চয়তা পত্র পেলাম। আমার আবেদন পত্রগুলোর কাজ অবশ্য আমাকে করতে হয়নি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তা হাসান ভাই সব করে দিয়েছেন। আমার রাশিয়া যাওয়ার পেছনে যার ভূমিকা বেশি তিনি হলেন জামালপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক রেদুয়ান ভাই এর। আগেই যেহেতু নির্ধারিত হয়েছে আমাদের টিকিট কত তারিখের তাই কবে যাবো সেটাই ছিল নির্ধারণের বিষয়। আমরা একটি খেলার টিকিট কিনে ছিলাম কারণ হলো বাংলাদেশে টিকিটের দাম বেশী পড়ে চার্জের জন্য। আমাদের টিকিটের মূল্য ছিল ১৮৫ ডলার করে। সারচার্জসহ বাংলাদেশী টাকায় ২০/২২ হাজার টাকা করে পড়েছে। আমাদের আগেই ইচ্ছে ছিল রাশিয়া গিয়ে অন্যান্য খেলার টিকিট ক্রয় করবো। আমরা ২৫ জুন ২০১৮ দিবাগত রাত ৫.৩০ মিনিটের ফ্লাইটে রাশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঠিক সাড়ে চার ঘন্টা পর সারজা বিমান বন্দরে বিরতির জন্য নামলাম। দেড় ঘন্টা বিরতির পর রাশিয়ার মস্কোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সাড়ে ছয় ঘন্টা পর মস্কোর একটি বিমান বন্দরে নামলাম। আমরা ৪ জন এক সাথে গিয়েছি আমি রেদুয়ান ভাই জামালপুর জেলার অতিরিক্ত সাধারণ সম্পাদক সোহেল ভাই এবং টাঙ্গাইলের সাবেক কৃতি ক্রিকেট ও ফুটবলার পলাশ দা। সোহেল ভাইয়ের এক বন্ধুর মামা রাশিয়াতে থাকেন। তার মাধ্যমে মস্কো থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। থাকার ব্যবস্থাটি বাংলাদেশ থেকেই তার সাথে যোগাযোগ করে করা হয়। একজন বাংলাদেশী সেখানে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। তার ওখানে ৩টি রুম সাব ভাড়া দিয়ে থাকেন।তারই ২টি রুম আমাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে। সোহেল ভাইয়ের সেই মামা বিমান বন্দরে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বিমান বন্দর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই উনাকে পেলাম। কি সুন্দর বিমান বন্দর, কত ভাবে সাজানো গুছানো। বের হতেই দেখতে পেলাম একটি বড় ফুটবল বানিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। তার পিছনেই মেলার মত বিশ্বকাপ ফুটবলের বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে সাজানো হয়েছে স্টল। আমি কিছু কেনার আগ্রহ প্রকাশ করতেই মামা বললেন, প্রচুর দাম এখান থেকে কিনতে পারবেন না। দুটি টেক্সিতে ৫জন রওনা হলাম বাসস্থানের উদ্দেশ্যে। ঘন্টা দুয়েক পরে উপস্থিত হলাম সেই স্থানে। ছয়তলা আনেক বড় একটি পুরনো বিল্ডিং। তিন তলাতে থাকেন যে লোক। লাগেজ ব্যাগ নিয়ে উঠলাম। সেই লোক নেই রুমে । তার ছোট ভাই এবং স্ত্রী আছেন। তারা বসতে দিলেন। পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা। বিমানে যে খাবার দিয়েছে তা আবার আমি খেতে পারি না। কিছু পরিমাণ খেয়েছি। তবে সবারই ক্ষুধা পেয়েছে। তার ছোট ভাই জানালেন বড় ভাই না আসলে কোন ব্যবস্থাই করা হচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি আসলেন। অসার পর তিনি যে কথা বলেন তাতে তো আমরা হতভাগ। বলেন কি? বাংলাদেশে থাকতে কথা হয়েছিল তিনবেলা খাওয়া এবং থাকা সহ জনপ্রতি ৪০ ডলার করে দিতে হবে, কিন্তু আমার যাওয়ার পর তিনি বললেন জনপ্রতি ৫০ ডলার দিতে হবে শুধু থাকার জন্য। আর দু’বেলা খাবার দিবে তার জন্য দিতে হবে ২০ ডলার। রেদুয়ান ভাই বললেন, ভাই ঠিক আছে, আগে আমাদের খাবার দিন ক্ষুধা পেয়েছে, খেয়ে নিই পরে একটা সমাধান হবে। সেই লোক বললেন আগে ফাইনাল করেন পরে খাবার দিব। এটা হোটেল না খেয়ে চলে যাবেন। কথাটি শুনার সাথে সাথে আমার তো পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। রাগের সুরেই বললাম আপনার বাড়ী কই? কুষ্টিয়া বলার সাথে সাথে বললাম বেচে গেলেন। আমাদের আশপাশে হলে রক্ষা ছিল না। তিনিও রাগের সুরে বললেন আপনি কি বলতে চান? সাথে সাথে রেদুয়ান ভাই বললেন, আর এক মিনিটও এখানে থাকবো না। সেই মামাকে বললেন আমাদের একটি টেক্সি ডেকে দিন, আমরা অন্য কোন গেষ্ট হাউজে যাব, মামা বললেন সিট পাওয়া কঠিন। আমি অনেক চেষ্টা করেছি। তার পরও আমরা বের হলাম। টেক্সির জন্য রাস্তা দিয়ে হাটছি।একটু যাওয়ার পরই বা পাশে সুন্দর একটি বিন্ডিং। সাইন বোর্ডের লেখা দেখে বুঝাগেল এটা কোন গেষ্ট হাউজ। মামা রাশিয়ার ভাষা বলতে পড়তে পারেন। কারণ তিনি ৭ বৎসর যাবৎ রাশিয়াতে আছেন। তিনি বললেন এটা গেষ্ট হাউজ নাম হোটেল এসপি। যেখানে গিয়ে কথা বলে জানাগেল একটি রুম খালি আছে ৪ বেডের। ভাড়া দৈনিক ৭ হাজার ৫শত টাকা রাশিয়ান টাকা। রুম দেখলাম খুব সুন্দর আমাদের পছন্দ হলো। সাথে সাথেই ভাড়া নিয়ে নিলাম। রুমের পাশেই কিচেন। সব ব্যবস্থা আছে। রান্না করে খাওয়া যায়। রাশিয়াতে রুশ ভাষা ছাড়া অন্যকোন ভাষার ব্যবহার নেই, এমনকি ইংলিশও না। কোন কিছুতেই তারা অন্য ভাষা ব্যবহার করে না। ৯৯ শতাংশ মানুষ ইংরেজী সহ অন্য কোন ভাষাই বুঝে না। খুব মুশকিল কথা বুঝানো। তারা টয়লেটে পানি ব্যবহার করে না, টিসু ব্যবহার করে। আমাদের তো সম্ভব না বিধায় বোতলে করে পানি নিয়ে যেতে হতো। সেখানকার লোকেরা ভাত খায় না। তাই হোটেলে ভাত পাওয়া যায় না। ফাস্টফুট বেশি খায়। ফার্মের মুরগী, গরু এবং শুকরের মাংস দিয়ে তৈরী খাবারই বেশি। আমি এ তিনটির কোনটিই খাই না। তাই আমার জন্য আরো কঠিন হয়ে গেল। তবে চাউল, তেল, সবজি সবই কিনতে পাওয়া যায়। রান্না করে খেতে হয়। আমরা চাউল ডাউল সবজি ডিম কিনে রান্না করে খেয়েছি মস্কোতে। সেখানে গুড়া মশলা পাওয়া যায় না। সব ধরণের সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়। মাছের তৈরী ফাস্টফুট পাওয়া যায়। খেয়েছি খুব স্বাদ। তারা পানির চেয়ে জুস খায় বেশী। বিভিন্ন ফলের জুসের চেয়ে পানির দাম বেশী। এমনকি বিয়ারে চেয়ে পানির দাম বেশি। সেখানে সকল জিনিসের দাম বেশি। শুধু মদ বিয়ার এবং সিগারেটের দাম কম। সিগারেট নির্দিষ্ট স্থানে দাড়িয়ে খেয়ে ডাস্টবিনে ফেলতে হবে।মদ, বিয়ার খেতে হবে যে কোন রুমে বসে বা বসায়। খোলামেলা স্থানে জন সম্মুখে খাওয়া যাবে না। রাস্তা এবং ফুটপাতগুলো ঝিক ঝিক করছে। কোন ময়লা দূরের কথা একটু বালি পর্যন্ত পাওয়া যাবে না। জামা কাপড় ময়লা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই। রাস্তা এবং ফুটপাত ঝাড়– দেয়া হয় গাড়ির মাধ্যমে। ছোট ছোট গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছে আর নিচের গোল গোল ঝাড়–র মত বস্তু দিয়ে পরিস্কার করা হচ্ছে। দিনে ৩ বার রাস্তা এবং ফুটপাতে পানি দেওয়া হয় ফোয়ারার মত পানি ছিটিয়ে গাড়ির সাহায্যে। মানুষের ব্যবহার অমায়িক। হাজার হাজার মানুষ মেট্রো রেলে চলাচল করছে, কিন্তু কোন হইহুল্লুর, ঝামেলা, জোড়ে কথা বলা কিছু নেই। এত মানুষ শব্দ নেই। রাস্তায় নেই যানজট। সেখানে গাড়ী চলে ডানপাশ দিয়ে । মানুষ চলাচলও করে ডানপাশ দিয়ে। চলাচলের স্থান দিয়ে কেহ বা পাশে যাবে না। চলন্ত সিড়ি দিয়ে মেট্রো স্টেশনে উঠতে নামতে হয়। সেখানেও সিড়িতে ডান পাশ ঘেষে দাড়াতে হয়, বাপাশে খালি থাকে। যদি কেহ দ্রæত উঠতে বা নামতে চায় তার জন্য খালি রাখা হয়। তাদের কথাবার্তা আচার ব্যবহার খুব ভালো। ১২ দিন রাশিয়াতে ছিলাম এর মধ্যে কাউকে দেখি নাই উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে, ঝগড়া মারামারি তো দূরের কথা। তারা আইন প্রচন্ডভাবে পালন করে। পরিশ্রম করে। রিক্সা, অটো সিএনজি নাই। বাস বা মেট্রোরেল থেকে নেমে যার যার গন্তব্য স্থানে হেটে চলে যাচ্ছে। লাইট পোষ্টগুলো ডালাইকরা খুব সুন্দর। ইলেকট্রিক বা অন্যকোন তার রাস্তার উপর দিয়ে ঝুলানো নেই, সবই মাটির নিচ দিয়ে স্থাপন করা। ল্যান্ডফোনের তার এক বিল্ডিং থেকে অন্য বিল্ডিং-এ টেনে নেয়া হয়েছে, তবে এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে নীচ দিয়ে নয়।বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখতে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের যেন অসুবিধা না হয় তার জন্য সারা শহরে দেয়া হয়েছিল ভলেন্টিয়ার। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের গঠন করা হয়েছে ভলেন্টিয়ার। তারা রাস্তা মেট্রোরেল স্টেশন, রেলস্টেশন, বাস ষ্টেশনসহ সারা শহর জুড়ে অবস্থান করছেন। তারা নিজেরাই এসে জিজ্ঞাসা করে কোন সাহায্যের দরকার আছে কিনা। আইন শৃঙ্খলার জন্য রাখা হয়েছে যত ধরণের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী আছে সকলকেই রাস্তার দু’পাশে স্টেডিয়ামের চারিদিকে এবং আবাসিক হোটেলের পাশে। আমরা যে ক’দিন গেষ্ট হাউজে ছিলাম বিমান বাহিনীর সাদা পোষাক পরিহিত একজন সদস্য এসে জিজ্ঞাসা করে যেতেন কোন সমস্যা আছে কিনা। আমরা গেষ্ট হাউজের রুমে লাগেজ রেখে পোষাক পাল্টিয়ে গোসল করে খাবার খেতে বের হলাম। ফাস্টফুট ছাড়া উপায় নেই, তাই আমি পাউরুটি-জুস খেলাম। পানির দাম বেশির জন্য গেষ্ট হাউজগুলোতে মিনারেল ওয়াটার সার্ভিস আছে যা সরকারিভাবে প্রদান করা হয়েছে। আমরা প্রথম দিকে পানি কিনে খাই। আমাদের পানি কিনে খাওয়া দেখে গেষ্ট হাউজের মালিক বললেন কিনে খাওয়া পানির চেয়ে সরকারী সাপ্লাইকৃত পানি ভালো। সেটাই খাওয়ার জন্য। সেদিন শুধু শহর ঘুরে দেখলাম এবং ডলার ভাংগিয়ে বাজার করে রাতে রান্না করে খেলাম। সেখানে রাত বলতে ৩ ঘন্টা বাংলাদেশের চেয়ে পার্থক্য। সেখানকার ৯টা বাংলাদেশে ১২টা । সেখানকার সময় রাত ১২টা/সাড়ে ১২টার সময় সূর্য ডুবে। আবার ৩টা/৪টায় সূর্য উঠে। রোদ ঝকঝক করে। তাদের অফিস সকাল ১০টা থেকে ৬টা পর্যন্ত । সময় ধরে তারা ঘুমায়। রুমগুলো এমনভাবে করা সবসময় অন্ধকার অন্ধকার ভাব। বাতি নিভালে রাত মনে হয়। কোন রুমেই ফ্যান নাই। হঠাৎ হঠাৎ কয়েকটি রুমে এসি লাগানো। তবে প্রতিটি রুমেই হিটার লাগানো রুম গরম করার জন্য। বিদ্যুৎ যেভাবে আসে হিটারও সেভাবে চলে সরকারিভাবে। শুধু রুম নয়, বাস, ট্রেন, ষ্টেশন সব স্থানেই হিটার লাগানো। আমরা যে সময় গিয়েছি তখন তাপমাত্রা ১৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার কারণে হিটার বা ফ্যানের দরকার হয়নি। সূর্যের আলো আছে কিন্তু শরীর ঘামে না। ঢাকা বিমান বন্দর থেকে ভোর সাড়ে ৪টায় বিমানে উঠে সাড়ে ৪ ঘন্টা, সারজায় ১ দেড় ঘন্টা, টেনজিট পর সাড়ে ৬ ঘন্টায় মস্কো। এই দীর্ঘক্ষণ বিমানে থাকায় এবং রুমে থাকা নিয়ে না খাওয়ায় শরীর ছিল ক্লান্ত। সবাই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠে ভাত আলুভর্তা, ডাউল ও ডিমভাজি করে খেয়ে রওনা হলাম মস্কো স্টেডিয়ামে, যেখানে ব্রাজিলের খেলা অনুষ্ঠিত হবে। যেখানকার সময় সকাল ১১টা-রাত ৯ টায় খেলা। স্টেডিয়ামে যাওয়ার পর আমাদের সাথে যাওয়া টাংগাইলের পলাশদার ঋঅঘ ওউ উঠালাম।তিনি বাংলাদেশ থেকে উঠাতে পারেননি। স্টেডিয়ামের পাশেই ঋঅঘ ওউ জন্য দুটি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। সকাল সকাল যাওয়াতে কোন দর্শকের দেখা পেলাম না শুধু নিরাপত্তারক্ষী ছাড়া স্টেডিয়ামের আশপাশ জুড়ে। আজকের খেলার টিকিট আমাদের ছিল না। তাই সকাল সকাল যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো টিকিট কিনা। আমাদের কাছে আগেই তথ্য ছিল স্টেডিয়াম এবং এর আশপাশে টিকিট কিনতে পাওয়া যায় । তখন যেহেতু কোন লোকই নাই টিকিট কোথায় পাবো। একটি টিকিট কাউন্টার দেখতে পেয়ে আশার সঞ্চার হলো হয়ত সেখানে টিকিট পাওয়া যেতে পারে। গেলাম সেখানে তারা জানালেন টিকিট অনেক আগেই অনলাইনে শেষ, এখন কোন ভুল হলে তা সংশোধন করা হচ্ছে। আমরা স্টেডিয়ামের পাশেই একটি ফাস্টফুটের দোকানে কিছু খেতে যাচ্ছি। এমন সময় ৬/৭জন ছেলে আমাদের কাছে এগিয়ে এলো। বয়স খুব বেশী নয় । দেখেই বুঝাগেল বাংলাদেশী। ওরা আমাদের জিজ্ঞাসা করলো আপনারা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন? তাদের সাথে কথা হলো, ওরা সিলেট থেকে এসেছে। ব্রাজিলের খেলার টিকিট পেয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই বললো না। আজকের খেলার টিকিট নেই, তবে তারা স্টেডিয়ামে গিয়েছিল সেখানে একজন লোক তাদেরকে টিকিট বিক্রির কথা জানিয়েছে। এ কথা শুনেই আমরা স্টেডিয়ামে চলে গেলাম। টিকিট মূল্য ১৮৫ ডলার। যে টিকিট বিক্রি করছে সে ৩’শ ডলার দাম চাইলেন, শেষে ২’শ ডলার করে ৪টি টিকিট কিনলাম। কিনার পর মনে হলো আর কোন খেলা না দেখলেও আফসোস নেই । কারণ ব্রাজিলের টিকিট আমাদের ছিল না। টিকিট পেলাম মানে মুক্ত মানিক পেলাম। আনন্দে ছবি তুলতে লাগলাম। আমাদের সামনেই দেখতে দেখতে টিকিটের মূল্য লাফিফে লাফিয়ে বাড়তে লাগলো ৩, ৪, ৫’শ ডলার। নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে হলো। টিকিটও পেলাম আবার কমদামে। আমার গায়ে ব্রাজিলের জার্সি দেখে অনেক ব্রাজিলিয়ানরা খুশি। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ফর ইউ? বাংলাদেশ বলতেই ও ও বলে জড়িয়ে ধরলেন। তারা আনন্দ প্রকাশ করছে তারা ছাড়াও বাংলাদেশে ব্রাজিলের সমর্থক আছে এটা ভেবে। অনেক রংবেরং মানুষের সাথে ছবি উঠালাম, ফেসবুকে পোস্ট দিলাম। খেলা দেখলাম। ব্রাজিল জয় লাভ করলো খুশিতে রুমে ফিরলাম। পরের দিন অর্থাৎ ২৮ জুন বের হলাম মস্কো শহর ঘুরতে। কি অপরূপ সুন্দর শহর। বর্ণিল সাজে সাজানো হয়েছে মস্কো শহর। গেলাম রেড স্কয়ার-এ সারা দিন ঘুরলাম। দেখলাম কত কি। দেখলাম মস্কো ঘন্টা। ছবি উঠালাম রেড স্কয়ার সহ বিভিন্ন স্থানে। রাতে জাকির হোসেন বাচ্চু বাংলাদেশ থেকে ফোন দিল, বললো নকলা উপজেলার ছেলে শুভ্র মস্কোতে পড়াশুনা করে ও আপনার সাথে যোগাযোগ করবে। ওর সহযোগিতা নিতে পারেন। ফেসবুকে আমার রাশিয়ার মোবাইল ফোন নাম্বার দিলাম। বাংলাদেশ থেকে অনেকে ম্যাসেঞ্জারে এবং মোবাইল ফোন নাম্বারে কথা বলেছেন, খোজ খবর নিয়েছেন তাদের সকলকে ধন্যবাদ জানাই।শুভ্রও ফোন দিল এবং আমার ঠিকানা নিল দেখা করার জন্য। খুব ভালো মেধাবী একজন ছেলে শুভ্র। শুভ্র এর সহযোগিতায় আমাদের রাশিয়া ভ্রমণ অনেক সহজ হয়েছে। আমাদের নিয়ে মস্কো শহর ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে ধারণা দিয়েছে। জেনেছি অনেক কিছু ওর মাধ্যমে। ক্লাস এবং পরীক্ষা থাকায় সব সময় সময় দিতে না পারলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করেছে। ট্রেন বাসে টিকিট ক্রয়, কেনা কাটা করতে গেলে বুঝাতে না পারলে, আমরা কি বলতে চাচ্ছি তা শুভ্রকে আমরা বলতাম, আর শুভ্র তাদেরকে রাশিয়ান ভাষায় বলে বুঝাতো। সহজে আমাদের কাজ হয়ে যেত। ১ জুলাই আমাদের খেলা দেখার টিকিট ছিল নিজনী নভগারদ স্টেডিয়ামে। সেটা অন্য শহর। যেতে হবে ট্রেনে অথবা বাসে। বাসে যেতে অনেক সময় লাগবে বলে ট্রেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেহেতু খেলা ১ জুলাই তাই ৩০ জুন যেতে হবে। তাই আমরা ২৯ জুন সকালে রেল স্টেশনে গেলাম। সেখানেও ভলেন্টিয়ার। তারা জানালেন খেলার টিকিট থাকলে ট্রেনে ফ্রি যাওয়া যাবে। সেটা আমাদের জানা ছিল না। মেট্রো রেল এবং সরকারি বাস যেমন লাল এবং নীল রং এর বাসগুলো ঋঅঘ ওউ দের ফ্রি সার্ভিস দিচ্ছে। তারা চেষ্টা করলো আমাদের ফ্রি টিকিটের ব্যবস্থা করার জন্য, কিন্তু ১টি মাত্র সিট খালি আছে। অনেকেই খেলার টিকিট ক্রয়ের সাথে সাথেই ট্রেনের টিকিটও নিয়েছে। যার জন্য শেষ হয়ে গিয়েছে। তাই আমাদের ৪ জনের আর ফ্রি টিকিটের ব্যবস্থা হলো না। টাকা দিয়েই টিকিট নিলাম। জনপ্রতি সেখানকার ১৭০০ টাকা করে। টিকিট নিয়ে বাকী সময় ঘুরলাম শহর ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। রেল ষ্টেশনে দাড়িয়ে আছি এর মধ্যে একজন দম্পতি এসে বললেন, তাদের কাছে আর্জেন্টিনার খেলার টিকিট আছে। খেলা সোচিতে ট্রেনে যেতে ৩০ ঘন্টা লাগে। তারা যাবে না। আমি সেই টিকিট নিতে আগ্রহী কিনা অর্ধেক দামে দিবে। টিকিট ১টি আবার ৩০ ঘন্টা সময় অপর দিকে ১টি খেলার টিকিট এবং ট্রেনের টিকিট কেনা হয়ে গেছে তাই আর নেয়া হলো না। শহর ঘুরে রুমে এসে রান্না করে খাওয়া শেষে ঘুম।সেখানে জিনিসের এত দাম, ক্রয় করা কঠিন। যে টি শার্ট গুলো বাংলাদেশে ৪/৫’শ টাকা হবে সেখানে ৩/৪ হাজার টাকা। বিশ্বকাপ ১টা ফুটবলের দাম ২ হাজার ৫ শত টাকা। দেখা গেল সিগারেট, বিয়ার আর মদ ছাড়া সব জিনিসের দাম বেশী। তবে পাওয়া যায় সব কিছু। সেখানের সবজিগুলো বাংলাদেশের চেয়েও তর তাজা। এখানে গাছ পিয়াচ, ফুলকপি, পাতাকপি বেগুন সব পাওয়া যায়। সেখানে সূর্যমূখী তেলের প্রচলন বেশী। ৩০ জুন সকালে শুভ্র এলো রুমে আমাদের রেল ষ্টেশনের পৌছে দেওয়ার জন্যে। শুভ্র অনলাইনে নিজনীতে হোটেল রুম বুকিং করে দিল। বের হবো নিজনী যাওয়ার উদ্দেশ্যে, কিন্তু লাগেজ কি করবো। ৪ জনের ৪টি লাগেজ সাথে নিয়ে যাওয়া, আবার আনা মাত্র এক রাতের জন্য। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম নিজনী থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ যাবো। গেষ্ট হাউজের একটি লকার ৫ দিনের জন্য ভাড়া নিলাম ১২৫০ টাকায়। ৫ দিন পর আবার সেই গেষ্ট হাউজে থাকবো, সে ভাবেই রুম বুকিং দেওয়া হলো। বের হলাম রেল স্টেশনের উদ্দেশ্যে। শুভ্র বিভিন্ন পার্ক ও দর্শণীয় স্থান দেখালো। একটি ফাস্টফুট দোকানে খেয়ে আর্জেন্টিনার খেলা দেখলাম। রাত ১০:৩০ মিনিটে ট্রেন ছাড়লো নিজনীর উদ্দেশ্যে। ভোর ৫:৩০ মিনিটে নিজনী নভগারদ গজকাইয়া রেল ষ্টেশনে পৌঁছালাম। বাথরুম সেরে হাত মুখ ধুয়ে বের হলাম বাহিরে। কি সুন্দর দৃশ্য। প্রশস্থ রাস্তা, মেট্রো রেল ষ্টেশন, মার্কেট, গেষ্ট হাউজ, ফাস্টফুটের দোকান। ফেএফসি সহ নানান ধরণের ষ্টল এর মধ্যে ফিফার ষ্টল কয়েকটি। মস্কো সহ যে সকল প্রদেশে খেলার আয়োজন করা হয়েছে সে সকল প্রদেশের শহর গুলোতে বিভিন্ন স্থানে বসানো হয়েছে প্লাষ্টিকের মোবাইল টয়লেট। মার্কেট এর সামনে পার্কের মত অনেক খানি জায়গা ফাকা। সেখানে বিভিন্ন ধরণের ভাস্কর্য বসিয়ে ফুলের বাগান করা হয়েছে।রয়েছে বসার স্থান। হোটেলে উঠতে হবে ১২টায়। এ সময়টুকু কাটাতে হবে তাই বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। যে দিকে তাকানো যায় শুধু সুন্দর আর সুন্দর করে বানানো হয়েছে শহর। নয়নাভিরাম ভাবে সাজানো হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে। খেলা রাতে তাই রুমে উঠে বাজার করে রান্না করে খেয়ে নিলাম। ঘুমানোর সুযোগ নেই বা ইচ্ছেও নেই যদি কিছু দেখা বাদ পড়ে যায়। রাতে খেলা দেখতে বের হতে হবে। গেষ্ট হাউজ থেকে মেট্রোতে দুই ষ্টেশন পরেই ষ্টেডিয়াম। আরেক দেখার বিষয় হলো মেট্রো রেল এবং ষ্টেশন। আমরা মস্কো, নিজনী ও সেন্ট পিটার্সবার্গ শহর দেখেছি। তিনটি শহরেই মেট্রোরেল দেখার মত। শত শত ফুট মাটির নিচে ষ্টেশন। তিন স্তরের রেল লাইন। ২ থেকে ৩ মিনিট পরপর এক দিকে চলছে রেল। ৫২ টাকায় টিকিট কেটে ষ্টেশনে প্রবেশ করে যে কোন স্থানে যাওয়া যায়। অথবা যতক্ষণ ইচ্ছে থাকা যায়। ভোর ৫টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত রেল চলে। খেলা থাকলে সারারাত ট্রেন চলে। আমাদের ঋঅঘ ওউ কার্ড থাকাতে টিকিট কাটতে হয়নি। রেল ষ্টেশনগুলো এত সুন্দরভাবে করা হয়েছে যে একটির সাথে অপরটির মিল নেই। ভিন্ন ভিন্নভাবে সাজানো হয়েছে। ষ্টেশনগুলোর নির্মাণকাল লেখা হয়েছে। ১৯৫২ সনে নির্মিত ষ্টেশনও দেখেছি। এক ষ্টেশনে প্রবেশ করে শহরের যে কোন স্থানে যাওয়া যায়। পুরো শহরজুড়ে মেট্রো রেল। হাজার হাজার মানুষ মেট্রোরেলে চলাচল করছে। যার কারণে শহরের রাস্তায় তেমন মানুষ দেখা যায় না। মেট্রো রেলে চড়ে গেলাম নভগোরাদ স্টেডিয়ামে। হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করেছে স্টেডিয়ামে। সাথে নিয়েছিলাম বাংলাদেশের পতাকা। সেই পতাকা উড়িয়ে দাড়িয়ে রইলাম প্রায় ৩০ মিনিট। সেই পতাকা দেখে অনেকেই এসে জানতে চাইলেন আমি কোন দেশী (ফর ইউ)। আমি গর্বের সাথে বললাম বাংলাদেশী। এটা আমার দেশের পতাকা। অনেকেই গুড বলে চলে গেলেন। অনেকেই বললেন ইন্ডিয়ান? পাকিস্তান? আমার উত্তর না।আমি বাংলাদেশী, এটা আমার দেশের পতাকা ।
ও বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!!। খেলা দেখে রুমে আসলাম। আবার রান্না করে খাওয়া শেষে ঘুম। সকালে চেষ্টা করলাম নিজনী থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ কিভাবে যাওয়া যায়। দেখাগেল মস্কো গিয়ে সেন্টপিটার্সবার্গ যাওয়াই ভালো। সময় কম লাগবে এবং খরচও কম হবে। সেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। কিন্তু ট্রেনের টিকিট পাওয়া গেল না। কি করা যায়। সরণাপন্ন হলাম ভলেন্টিয়ারদের কাছে। তারা বললেন ওভার দিয়ে চলে গেলে খরচ কম হবে এবং সময় কম লাগবে। তখন দুপুর ১২টা। ওভার (প্রাইভেটকার) ডেকে দিলেন, ভাড়া ১০ হাজার ৫শত টাকা। উঠে পড়লাম ওভারে। রওনা হলাম মস্কোর পথে। কি সুন্দর রাস্তা ১৪০-১৫০ কিলোমিটার বেগে চলছে। রাস্তার দুপাশে শুধু গাছ আর গাছ। গাছগুলো একটু সরু অনেক লম্বা উচু। গাছের রং সাদা আর লাল ।
আসলাম মস্কো। তখন রাত ৯টা। বাসষ্ট্যান্ড গেলাম টিকিট কাটলাম ভলভো গাড়ীর। রাত সাড়ে ১০টায় ছাড়লো গাড়ী। রাত ১টার দিকে প্রচন্ড ঠান্ডা ছোট একটি হাত ব্যাগে কিছু কাপড় নিয়ে বের হয়েছি। তেমন শীত নেই বলে সাথে শীতের কাপড় নেইনি। আমার ব্যাগে রেদুয়ান ভাই এর একটি জ্যাকেট ছিল, গায়ে দিলাম। রেদুয়ান ভাই শীতে কাপছে আমার কাছে জ্যাকেট চাইতে পারছে না। আবার ঠান্ডাও সইতে পারছে না। অবশেষে ব্যাগ থেকে লুঙ্গী বের করে গায়ে দিলেন। মুখ দিয়ে হাসি বের হলেও হাসলাম না। কারণ আমার জন্যইতো তার এমন অবস্থা। সকাল সাড়ে ৭টায় সেন্ট পিটার্সবার্গ বাসষ্ট্যান্ডে পৌঁছালাম। পৌঁছেই ফিরতি টিকিট কেটে নিলাম। নিজনীর মত আগেই গেষ্ট হাউজ বুকিং দেয়া ছিল না। পরলাম মহা বিপদে। সেন্ট পিটার্সবার্গের চালচলন অন্যরকম। ইংরেজ ইংরেজ টাইপ। গেস্ট হাউজের কোন সাইনবোর্ড নেই। কাউকে বুঝাতে পারছি না। এ পর্যন্ত যতটুকু করেছি সেই শুভ্রর মাধ্যমে। ওর পরীক্ষা চলছে কত আর ডিসটার্ফ করা যায়। একটি গেটের সামনে দাড়িয়ে আছি দেখলাম একজন লোক ব্যাগ হাতে ভিতরে ঢুকছে, সাথে সাথে আমরাও প্রবেশ করলাম। সত্যই গেষ্ট হাউজ, কিন্তু রুম খালি নেই। তার সাহায্যে আরেকটি গেষ্ট হাউজে যাওয়ার পর সেখানেও রুম নেই বলে জানালেন। ফিরছি কি মনে করে।ভদ্র মহিলা ডাকলেন বললেন প্রতিরুম ১২ হাজার টাকা ভাড়া প্রতিদিন এমন একটি গেষ্ট হাউজ আছে আমরা নিতে আগ্রহী হলে তিনি ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। আমরা রাজি হওয়াতে ব্যবস্থা হলো, কিন্তু রান্নার ব্যবস্থা থাকলেও রান্না করে খাওয়া যাবে না। তবে সকালের নাস্তা হোটেল থেকেই দেওয়া হবে। গোসল সেরে বের হলাম। যেদিকে চোখ যায় মন জুড়িয়ে যায় স্থাপনা আর ভাস্কর্য দেখে। মস্কো ও নিজনীর চেয়েও বেশী ভাস্কর্য শহর জুড়ে। শুধু ফাস্টফুড মাংস দিয়ে তৈরী। সেখানে মাছেরটাও নেই। তাই আমাকে পাওয়ারুটি এবং জুস, পানি, ফল খেয়ে থাকতে হলো ২ দিন। ভাত ছাড়া সেখানে দুদিন থাকতে হলো। আমাদের কথা হলো ঘুম আর খাওয়া বড় কথা নয় খেলা আর শহর দেখতে হবে। খেলা দেখার জন্য সেন্টপিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে একটু আগেই গেলাম যেহেতু আমাদের টিকিট কিনতে হবে। গিয়ে দেখলাম টিকিট অহরহ, কিন্তু আইন শৃঙ্খলা বাহিনী টিকিট বিক্রি এবং ক্রয়ে বাধা প্রদান করছে। খুব গোপনে বিক্রি এবং ক্রয় চলছে। আমরা দেখলাম ক্রেতার চেয়ে বিক্রেতার সংখ্যা বেশী। তাই ১৮৫ ডলারের টিকিট ১০০ ডলারে ক্রয় করে খেলা দেখলাম। কিন্তু টিকিট দামাদামি করতে করতে দেরী হয়ে যাওয়াতে তাড়াতাড়ি স্টেডিয়ামে প্রবেশ করতে হলো। আমরা ৩টি খেলা দেখেছি। দু’বার বারপোস্টের পিছনে সিট ছিল। রেদুয়ান ভাই বলেন, আমাদের সিটগুঠো সবগুলোই ভালো স্থানে পড়েছে, কাছ থেকে খেলা দেখা হলো। স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় নিজ নিজ গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে হলেও ভিতরে যাওয়ার পর যে যেকোন স্থানে যেতে পারে তবে নিজ আসনে বসতে হবে। স্টেডিয়ামের আসন ব্যবস্থা নীচ থেকে উচু পর্যন্ত সকল আসনই মনে হয় কাছে। খাড়াখাড়ি ভাবে গ্যালারী করা হয়েছে। উচু হয়েছে ঠিকই কিন্তু দূরত্ব কম। এত উচুতে আসন দেখে আমার কৌতহল হলো এত উচু থেকে কেমন দেখা যায়। হাফ টাইমের সময় আমি স্টেডিয়ামের ভিতরটা ঘুরে দেখেছি। উচু স্থান থেকেও মনে হয়, কাছ থেকে দেখছি।ভিতরের গ্যালারীর তিনপাশে যাওয়া যায় আরেক পাশে মিডিয়া, ফিফা সহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের স্থান। তাই সেই অংশে যাওয়া যায় না। খেলা দেখে বের হতে হয় একটি রাস্তা দিয়ে। আমি প্রথম দিকেই বের হয়ে রাস্তার পাশে ‘জাতি সংঘে বাংলা চাই’ লেখা সংবলিত একটি টিশার্ট পরে দাড়িয়ে রইলাম। অনেকেই যাত্রা বিরতী দিয়ে আমাকে দেখেছেন। ছবি তুলেছেন বিদেশী টিভির সাংবাদিকেরা। ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন আবার অনেকে সেলফিও তুলেছেন। সেই পতাকা উড়ানোর ছবি এবং জাতিসংঘে বাংলা চাই এর ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর আমার ফেসবুক বন্ধুগণ খুব সুন্দর সুন্দর ভালো মন্তব্য করেছেন। তাদেরকে এ লিখনির মাধ্যমে ধন্যবাদ জানাই। ৩ জুলাই সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনের খেলা দেখে বের হলাম শহর দেখতে। শহর ঘুরে আবার গেষ্ট হাউজে। পরের দিন ৪ জুলাই রাত ১০:৩০ মিনিটে বাস ছাড়বে মস্কোর উদ্দেশ্যে। তাই সারাদিন বেড়ানোর স্থান নির্ধারণ করা হলো জাহাজে করে যাবো পিটারগোভ। যেতে সময় লাগে ৩০ মিনিট ভাড়া জনপ্রতি ১ হাজার টাকা। সেখানে রাজবাড়ী, ফোয়ারা, পার্ক, বাগান সহ বিশাল এলাকা দর্শনীয় স্থান। প্রবেশ মূল্য ৭৫০ টাকা জনপ্রতি বিদেশীদের জন্য। আর রাশিয়ানদের জন্য জন প্রতি ১শত টাকা। সেখানে ৩/৪ ঘন্টা অবস্থান করে আবার জাহাজে চলে আসলাম। হাতে অনেক সময়। ঠিক করলাম ঘন্টা চুক্তি টেক্সি নিয়ে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত বেড়াবো। সাথে কাধের ব্যাগ নিয়ে হোটেল ছেড়ে চলে এসেছি সুতরাং হোটেলে যাওয়ার আর দরকার নেই। একটি ওভার (টেক্সি) নিলাম। ড্রাইভার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অবসর সময়ে টেক্সি চালায়, অমায়িক ব্যবহার। শুভ্রর মাধ্যমে কথা বলে টেক্সিতে উঠে বসলাম। সে বললো শহরের সকল দর্শনীয় স্থান দেখাবে করলো ঠিক তাই ২য় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত যুদ্ধ জাহাজ, ট্যাংক, কামান সকল কিছুই দেখলাম। শহর ঘুরতে ঘুরতে কখন ৯টা বেজে গেছে বুঝার উপায় নেই।চলে এলাম বাসষ্ট্যান্ডে। খুব সকালে পৌছালাম মস্কো। আবার সেই হোটেল এসপিতে। গোসল নাস্তা সেরে আবার দর্শনীয় স্থান দেখা। শুভ্র পরীক্ষার কারণে আসতে পারেনি। চলে আসা দিন পর্যন্ত ওর সাথে আর দেখা হয়নি কথা হয়েছে। এ সময়ে এমন ছেলে পাওয়া খুব কঠিন। ভদ্র বিনয়ী মেধাবী বলতে যা বুঝায় সকল কিছুই ওর মাঝে আছে। দোয়া করি ওর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য। এমন ভালো ছেলের ভবিষ্যৎ অবশ্যই ভালো হবে। ভালো থেকো শুভ্র। দেখতে গেলাম সেই স্টেডিয়ামকে যেখানে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনাল খেলা। লুজনিকি স্টেডিয়াম। ভিতরে প্রবেশ করা গেলো না। সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ চলছে তাই প্রবেশ নিষেধ। বাহির থেকে দেখে চলে এলাম। যতগুলো স্টেডিয়াম দেখেছি, একটির আরেকটির মিল নেই। সবই ভিন্ন ধরণের, চমৎকার নকশা করা, দেখতে বাহিরেও যেমন ভিতরেও তেমন। সেমি-ফাইনাল, ফাইনাল খেলার টিকিট ম্যানেজ করা যেত, চড়া দামে ক্রয় করতে হতো, আবার থাকা খাওয়ার খরচ এত টাকা সাথে ছিল না, ম্যানেজ করাও সম্ভব নয় বিধায় দেখা হয়নি। মস্কোতে যাওয়ার সময় যে বিমান বন্দরে নেমে ছিলাম, আসার সময় অন্য বিমান বন্দর দিয়ে আসতে হলো। এমনই ছিল টিকিটে। সকালে টেক্সি দিয়ে প্রায় ৩ ঘন্টা শহর হয়ে আসলাম বিমান বন্দরে। রাশিয়াকে বিদায় জানিয়ে ১৩ ঘন্টা পর বিমানে সাড়ে ১১ ঘন্টা সারজায় টেনজিট শেষে ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ। আনুষ্ঠানিকতা শেষে মহাখালি থেকে সাদিকা বাস সার্ভিসে আসলাম প্রিয় শেরপুরে। আমার শেরপুরবাসীর কাছে, পরিবারের কাছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.